ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন ও পরবর্তীতে হত্যার অপরাধে স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন ও পরবর্তীতে হত্যার অপরাধে স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
 বিপ্লব কুমার দাস, ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধিঃ
যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে অমানবিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে বিষজাতীয় তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ জোরপূর্বক খাইয়ে নির্মমভাবে হত্যার অপরাধে ফরিদপুরে মো. জিল্লুর মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর পর মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হলো।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি জিল্লুর মোল্যা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের আছাদ মোল্যার ছেলে জিল্লুর মোল্যার সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিবাহের পর থেকেই যৌতুকের দাবিরে স্ত্রীকে ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন জিল্লুর। এ নিয়ে দম্পতির মধ্যে প্রায়ই তীব্র কলহ সৃষ্টি হতো।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বিকেল ৩টার দিকে স্বজনেরা খবর পান যে, দুপুর ১টার দিকে স্বামীর বাড়িতে ওই নারী ‘গুল’ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে স্বজনেরা আলফাডাঙ্গায় আসামির বাড়িতে গিয়ে উঠানের চৌকির ওপর ভুক্তভোগীর লাশ দেখতে পান।
ঘটনায় আলফাডাঙ্গা থানায় একটি অপমৃত্যু ও হত্যা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়। আলফাডাঙ্গা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিমুদ্দিন মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন। পুলিশের গভীর তদন্ত ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদনে উঠে আসে, ঘটনাটি কোনো আত্মহত্যা ছিল না; বরং জোরপূর্বক বিষাক্ত উপাদান খাইয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত নিকোটিনের তীব্র বিষক্রিয়ায় ওই নারীর মৃত্যু হয়। ভুক্তভোগীর শ্বাসনালি ও পরিপাকতন্ত্রে তামাকজাত ‘গুল’-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামত অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার দরুন মারাত্মক শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতায় তার করুণ মৃত্যু ঘটে এবং এটি একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড।
তদন্ত শেষে এসআই নাজিমুদ্দিন আসামি জিল্লুর মোল্যাকে একক অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় সাক্ষী ও ডাক্তারি প্রমাণ উপস্থাপন করে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
রায়ের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন জানান, “যৌতুকের কারণে গৃহবধূকে নির্যাতন ও নৃসংসভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারকের এই রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। সমাজে যৌতুকলোভী ও নির্যাতনকারীদের কাছে বিচার বিভাগের এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।”
বিজ্ঞাপন
ট্যাগ
জনপ্রিয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবি’র পৃথক অভিযানে ভারতীয় মদ ও ফেয়ারডিল সিরাপ জব্দ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবি’র পৃথক অভিযানে ভারতীয় মদ ও ফেয়ারডিল সিরাপ জব্দ

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন ও পরবর্তীতে হত্যার অপরাধে স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

আপডেট সময় : ১১:৪৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
 বিপ্লব কুমার দাস, ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধিঃ
যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে অমানবিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে বিষজাতীয় তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ জোরপূর্বক খাইয়ে নির্মমভাবে হত্যার অপরাধে ফরিদপুরে মো. জিল্লুর মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর পর মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হলো।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি জিল্লুর মোল্যা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের আছাদ মোল্যার ছেলে জিল্লুর মোল্যার সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিবাহের পর থেকেই যৌতুকের দাবিরে স্ত্রীকে ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন জিল্লুর। এ নিয়ে দম্পতির মধ্যে প্রায়ই তীব্র কলহ সৃষ্টি হতো।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বিকেল ৩টার দিকে স্বজনেরা খবর পান যে, দুপুর ১টার দিকে স্বামীর বাড়িতে ওই নারী ‘গুল’ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে স্বজনেরা আলফাডাঙ্গায় আসামির বাড়িতে গিয়ে উঠানের চৌকির ওপর ভুক্তভোগীর লাশ দেখতে পান।
ঘটনায় আলফাডাঙ্গা থানায় একটি অপমৃত্যু ও হত্যা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়। আলফাডাঙ্গা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিমুদ্দিন মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন। পুলিশের গভীর তদন্ত ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদনে উঠে আসে, ঘটনাটি কোনো আত্মহত্যা ছিল না; বরং জোরপূর্বক বিষাক্ত উপাদান খাইয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত নিকোটিনের তীব্র বিষক্রিয়ায় ওই নারীর মৃত্যু হয়। ভুক্তভোগীর শ্বাসনালি ও পরিপাকতন্ত্রে তামাকজাত ‘গুল’-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামত অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার দরুন মারাত্মক শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতায় তার করুণ মৃত্যু ঘটে এবং এটি একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড।
তদন্ত শেষে এসআই নাজিমুদ্দিন আসামি জিল্লুর মোল্যাকে একক অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় সাক্ষী ও ডাক্তারি প্রমাণ উপস্থাপন করে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
রায়ের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন জানান, “যৌতুকের কারণে গৃহবধূকে নির্যাতন ও নৃসংসভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারকের এই রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। সমাজে যৌতুকলোভী ও নির্যাতনকারীদের কাছে বিচার বিভাগের এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।”
বিজ্ঞাপন