বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। চার দিনের রিমান্ডে থাকা তাঁর জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের জেরে মদ্যপানের পর হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন মাঠে গিয়েছিলেন তাহসিফ। সেখানে মাদক সেবনের পর পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তুরাগ নদে পড়ে যেতে পারেন তিনি। তবে তাহসিফকে নদে পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন দীপ।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট টঙ্গী নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ এলাকার একটি বারে বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশার সঙ্গে যান তাহসিফ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বন্ধু দীপও। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তাঁরা মদ্যপান করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মদ্যপানের একপর্যায়ে দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্ক এবং ইয়াবা সেবন নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ হেরোইন সেবনের কথা বলেন। পরে তিনজনই বার থেকে বেরিয়ে যান।
বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। এরপর তাহসিফ ও দীপ আলাদাভাবে টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে রওনা হন।
মাঠে গিয়ে হেরোইন খোঁজার দাবি
রিমান্ডে দীপের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, টঙ্গীর মাজার বস্তির কাছে একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা গলি দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠে প্রবেশ করেন। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতি ছিল।
দীপের দাবি, মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন আছে কি না জানতে চান এবং প্রয়োজনীয় টাকা দেওয়ার কথাও বলেন। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে তাহসিফ সেবন করেন।
এ সময় পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উপস্থিত ব্যক্তিরা দৌড়ে পালাতে শুরু করেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনিও ভয়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে আশ্রয় নেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও দীপের ফিরে যাওয়া
দীপ জানান, কয়েক মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে পিলারের পেছনে দেখতে পেয়ে পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চান। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে জানান, তাঁর বাসা মোহাম্মদপুরে এবং তিনি তাহসিফের বন্ধু।
পুলিশ সদস্যরা তাঁকে রাতে সেখানে অবস্থান না করে বাসায় ফিরে যেতে বলেন। এরপর দীপ বস্তির একটি সরু গলি দিয়ে ভেতরে চলে যান। পথ চিনতে না পেরে এক ব্যক্তির সহায়তায় মূল সড়কে পৌঁছান। পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে মাঠের দিকে ফিরে যান।
সেখান থেকে তাহসিফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও ফোন বন্ধ পান বলে দাবি করেন দীপ। পরে তিনি নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে যান। তবে তাহসিফ ঠিক কখন বা কীভাবে নদে পড়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন।
সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ঘটনার রাতের টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে মোটরসাইকেল রেখে একটি গলি দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। এ সময় কয়েকজন নারী তাঁদের সেখানে যেতে নিষেধ করেন এবং ফিরে যেতে বলেন। ফুটেজে তাহসিফকে ইংরেজিতে দীপকে বলতে শোনা যায়, ‘বেশি কথা বলো না, হাঁটো।’
অন্যদিকে, সিসিটিভি ফুটেজের সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপকে মাঠ থেকে একা বের হতে দেখা যায়। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মায়ের মোবাইল ফোনে ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি রওনা হয়েছেন। ফলে দীপের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং তাহসিফের পাঠানো ভয়েস বার্তার সময়ের মধ্যে ঘটনাপ্রবাহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনার প্রাথমিক ধারণা পুলিশের
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তাঁর বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বারের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও দুজনের মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘটনাটি হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি নদে পড়ে যেতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। রিমান্ডে থাকা দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।
ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষা
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি তাঁর রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভিসেরা ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে তাঁর শরীরে মাদক বা বিষাক্ত কোনো পদার্থের উপস্থিতি ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জুনিয়র বন্ধু দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হন বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গভীর রাতে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তিনি। ওই রাত থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ।
পরদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে স্থানীয়দের মাধ্যমে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধারের স্থান ছিল প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে।
এ ঘটনায় তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদক সেবন ও পুলিশের উপস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পালানোর সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

























