ঠান্ডার দাপটে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে রোগীর ঢল শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ঠাঁই নেই—মেঝে ও করিডোরেও চলছে চিকিৎসা, ৪ দিনে প্রায় ৫০০ রোগী

ঠান্ডার দাপটে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে রোগীর ঢল শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ঠাঁই নেই—মেঝে ও করিডোরেও চলছে চিকিৎসা, ৪ দিনে প্রায় ৫০০ রোগী
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধায় তাপমাত্রার পরিবর্তন ও শীতের আবহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদর হাসপাতালে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত চার দিনে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এ সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য দুই বিভাগ থেকে ২০ জন রোগীকে রংপুরে রেফার্ড করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশু ও ডায়রিয়া রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। গত বুধবার ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এদিন শিশু ওয়ার্ডে ১১৪ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৫৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে দুই শিশুসহ তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।
এর আগে রোববার শিশু বিভাগে ৬৪ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৫৫ জন চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে চার শিশুসহ সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়।
সোমবার শিশু বিভাগে ৭৮ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৬৪ জন চিকিৎসা নেন। এদিন চার শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার শিশু বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন ৫৭ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৪১ জন। তাদের মধ্যে তিন শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়।
মেঝে-করিডোরেও রোগীর শয্যা
সরেজমিনে বুধবার দুপুরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নানা রোগে আক্রান্ত ভর্তি রোগীতে হাসপাতাল প্রায় পরিপূর্ণ। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই করিডোরের মেঝে, সিঁড়ির নিচে, প্রবেশমুখ ও বারান্দায় শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় রোগীদের। ওয়ার্ডের মেঝেতেও শয্যা পেতে চলছে চিকিৎসা।
একই চিত্র দেখা গেছে শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে একটি বেডে তিনজন পর্যন্ত শিশু রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জায়গার সংকটে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের।
নতুন ভবনের বহির্বিভাগেও ছিল রোগীর দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে শিশু রোগীদের নিয়ে চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায় স্বজনদের।
বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীও
এদিকে ঠান্ডাজনিত রোগের পাশাপাশি জেলাজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর চাপও রয়েছে। সিভিল সার্জন, জেনারেল হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার ২৪ ঘণ্টায় জেলার সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ২৫ জন, সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭৬ জনে। তবে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসহ সরকারি ব্যবস্থার বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাব যুক্ত হলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
হামের আক্রান্তও পাঁচ শতাধিক
অন্যদিকে, হামে আক্রান্ত হয়ে বুধবার গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২৪ জন। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯৪ জন।
এক বেডে তিন শিশু
হাসপাতালের ডায়রিয়া বিভাগে একটি বেডে তিন শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী আল আমিন, ১৮ মাস বয়সী মুসকান এবং নয় মাস বয়সী রেদওয়ান।
শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি দেড় মাস বয়সী শিশু রকিবের মা রোকসানা বেগম জানান, রকিবের জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে মঙ্গলবার বিকেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে চার দিন ধরে বাড়িতে অসুস্থ ছিল সে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি।
শীতের আবহ আরও বাড়লে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
ট্যাগ
জনপ্রিয়
“বিশ্বেসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় কুবির সাবেক শিক্ষার্থী

“বিশ্বেসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় কুবির সাবেক শিক্ষার্থী

ঠান্ডার দাপটে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে রোগীর ঢল শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ঠাঁই নেই—মেঝে ও করিডোরেও চলছে চিকিৎসা, ৪ দিনে প্রায় ৫০০ রোগী

আপডেট সময় : ১০:৩৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধায় তাপমাত্রার পরিবর্তন ও শীতের আবহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদর হাসপাতালে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত চার দিনে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এ সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য দুই বিভাগ থেকে ২০ জন রোগীকে রংপুরে রেফার্ড করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশু ও ডায়রিয়া রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। গত বুধবার ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এদিন শিশু ওয়ার্ডে ১১৪ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৫৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে দুই শিশুসহ তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।
এর আগে রোববার শিশু বিভাগে ৬৪ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৫৫ জন চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে চার শিশুসহ সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়।
সোমবার শিশু বিভাগে ৭৮ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৬৪ জন চিকিৎসা নেন। এদিন চার শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার শিশু বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন ৫৭ শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শিশুসহ ৪১ জন। তাদের মধ্যে তিন শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়।
মেঝে-করিডোরেও রোগীর শয্যা
সরেজমিনে বুধবার দুপুরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নানা রোগে আক্রান্ত ভর্তি রোগীতে হাসপাতাল প্রায় পরিপূর্ণ। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই করিডোরের মেঝে, সিঁড়ির নিচে, প্রবেশমুখ ও বারান্দায় শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় রোগীদের। ওয়ার্ডের মেঝেতেও শয্যা পেতে চলছে চিকিৎসা।
একই চিত্র দেখা গেছে শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে একটি বেডে তিনজন পর্যন্ত শিশু রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জায়গার সংকটে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের।
নতুন ভবনের বহির্বিভাগেও ছিল রোগীর দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে শিশু রোগীদের নিয়ে চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায় স্বজনদের।
বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীও
এদিকে ঠান্ডাজনিত রোগের পাশাপাশি জেলাজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর চাপও রয়েছে। সিভিল সার্জন, জেনারেল হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার ২৪ ঘণ্টায় জেলার সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ২৫ জন, সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭৬ জনে। তবে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসহ সরকারি ব্যবস্থার বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাব যুক্ত হলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
হামের আক্রান্তও পাঁচ শতাধিক
অন্যদিকে, হামে আক্রান্ত হয়ে বুধবার গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২৪ জন। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯৪ জন।
এক বেডে তিন শিশু
হাসপাতালের ডায়রিয়া বিভাগে একটি বেডে তিন শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী আল আমিন, ১৮ মাস বয়সী মুসকান এবং নয় মাস বয়সী রেদওয়ান।
শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি দেড় মাস বয়সী শিশু রকিবের মা রোকসানা বেগম জানান, রকিবের জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে মঙ্গলবার বিকেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে চার দিন ধরে বাড়িতে অসুস্থ ছিল সে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি।
শীতের আবহ আরও বাড়লে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বিজ্ঞাপন