আলি হায়দার, কুলিয়ারচর কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের দোয়ারিয়া গ্রামে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার ঘটনা। বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত কূপে পড়ে যায় একটি কুকুর। কূপের অন্ধকার পানিতে তখন প্রাণপণে ভেসে থাকার চেষ্টা করছিলো প্রাণীটি। আর উপরে একে একে জড়ো হচ্ছিলো গ্রামের মানুষ।
প্রথমে কুকুরটিকে দেখতে পান স্থানীয় দুই বাসিন্দা সৈয়দ সাহান ও হেদায়েতউল্লাহ। অপেক্ষা না করে নিজেরাই শুরু করেন উদ্ধারের চেষ্টা। প্রায় ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও কুকুরটিকে তুলতে না পেরে তারা খবর দেন এলাকার সামাজিক ও মানবিক কাজে সক্রিয় ফয়সাল আহমেদ তুহিনকে। তিনি অন্যদের নিয়ে আরও প্রায় আধা ঘণ্টা চেষ্টা করেন। দড়ি, বালতি, মইসহ নানা উপায়ে চেষ্টা করেও সফলতা আসেনি। একপর্যায়ে প্রয়োজন পড়ে ফায়ার সার্ভিসের।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ফোন করা হলে ঘটনাস্থলে আসার কথা জানানো হয়। কিন্তু কিছু সময় পরও দল না আসায় আবার যোগাযোগ করেন স্থানীয়রা। তখন তাদের জানানো হয়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যেতে প্রস্তুত থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না।
এরপর শুরু হয় অনুমতির জন্য দৌড়ঝাঁপ। স্থানীয়দের ভাষ্য, কিশোরগঞ্জ জেলা অফিস থেকে ময়মনসিংহ বিভাগের ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত যোগাযোগ করতে হয়। এদিকে কূপের পানিতে থাকা কুকুরটির অবস্থাও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিলো। কিন্তু হাল ছাড়েননি স্থানীয়রা। যে যার মতো করে দড়ি, বালতি, মইসহ প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।
ফয়সাল আহমেদ তুহিনের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথমে তাকে বলেন, এ ধরনের উদ্ধারকাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। পরে গাড়ি পাঠাতে হলে খরচ ও জ্বালানি ব্যয় বহন করতে হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। প্রাণীটিকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করবেন বলে স্থানীয়রা রাজি হয়। তবে দ্রুত গাড়ি পাঠানোর অনুরোধ জানালে ওই কর্মকর্তার আচরণ নিয়েও আপত্তিকর ছিলো বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
তবে পুরো ঘটনায় কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মীদের প্রতি সন্তুষ্ট স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় স্টেশনের কর্মীরা শুরু থেকেই উদ্ধারে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুমতি না পাওয়ায় তাদের ঘটনাস্থলে যেতে বিলম্ব হয়।
সময় যত গড়াচ্ছিল, কূপের ভেতরের কুকুরটির অবস্থাও তত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছিলো। খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন। কেউ দড়ি নিয়ে আসেন, কেউ বালতি, কেউ মই। একটি অসহায় প্রাণকে বাঁচাতে পুরো গ্রামের মানুষ তখন একসঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
অবশেষে রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় চূড়ান্ত উদ্ধার অভিযান। প্রায় ২৫ মিনিটের চেষ্টায় রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে কূপ থেকে জীবিত অবস্থায় কুকুরটিকে তুলে আনা হয়।
কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মাজেদুল ইসলাম বলেন, প্রথমে আমরা ৯৯৯-এ একটি কল পাই। পরবর্তী সময়ে জেলা ও বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা কূপ থেকে কুকুরটি উদ্ধার করি।
তবে কুকুর উদ্ধারে খরচ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, এটা ভুয়া কথা। অনেক সময় মানুষ সেন্টিমেন্টাল হয়ে এ ধরনের কথা বলে।
মোফাজ্জল হোসেন বলেন, দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে রওনা হয়। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তারা রওনা হতে পারেন। তবে অন্যান্য উদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে ঘটনাস্থলে যেতে কিছুটা সময় লাগে।
কুলিয়ারচরে কুকুর উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, কুকুর উদ্ধারের বিষয়টি বিভাগের স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা উদ্ধার করেছি। তাঁর ভাষ্য, কুকুর-বিড়ালসহ প্রাণী উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রাণীটি হিংস্র কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা পৌর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা বলা হয়। তিনি বলেন, এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোনো নির্দেশনা নেই। আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব কাজ করি।
একটি বেওয়ারিশ কুকুরকে বাঁচাতে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে লড়েছেন স্থানীয়রা। ফায়ার সার্ভিসের দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রাণীটিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।





















