ইয়াকুব সরকার, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার-হাজীর বাজার সড়কে চলতে গিয়ে হঠাৎই চোখ আটকে যায় পথচারীদের। সড়কের দুই পাশের গাছে ঝুলছে ছোট ছোট প্ল্যাকার্ড। কোথাও লেখা— “অকারণে গাছ কাটবো না”, কোথাও “পাখি আমাদের বন্ধু”, আবার কোথাও “মাদককে না বলি” কিংবা “অযথা হর্ণ বাজাবেন না”। ব্যতিক্রমী এসব বার্তা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি ছড়িয়ে দিচ্ছে সচেতনতার আলো।

অনেকে প্রথমে ভেবেছিলেন, কোনো সামাজিক সংগঠন বা পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ নিয়েছে। পরে জানা যায়, সবগুলো প্ল্যাকার্ড লিখেছে মাত্র ১০ বছরের এক স্কুলশিক্ষার্থী— মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ।
মুগ্ধ ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা। সে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়িতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কার্টুন, খাতার ছেঁড়া পাতা, আটা ও সুতা ব্যবহার করে নিজ হাতে তৈরি করেছে এসব প্ল্যাকার্ড। এরপর বন্ধুদের নিয়ে সড়কের গাছে গাছে সেগুলো টাঙিয়ে দিয়েছে।
প্ল্যাকার্ডগুলোতে পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা, ধূমপানবিরোধী বার্তা এবং নৈতিক মূল্যবোধের আহ্বান তুলে ধরা হয়েছে। ছোট ছোট এসব বাক্য এখন পথচারীদের মাঝে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
পথচারী ওবায়দুল হক বলেন, “নিয়মিত এ পথে চলাচল করি। হঠাৎ দেখি গাছে গাছে সচেতনতামূলক বার্তা। পরে জানতে পারি এগুলো একটি শিশুর লেখা। এত ছোট বয়সে এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”
ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “মুগ্ধের কাজ আমাদের বড়দের জন্যও শিক্ষা। সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় সবাই এগিয়ে এলে তার উদ্যোগ সার্থক হবে।”
মুগ্ধের সহপাঠীরা জানায়, প্রতিদিন বিকেলে তারা মই ও সুতা নিয়ে মুগ্ধের সঙ্গে বের হয়। সবাই মিলে গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড বেঁধে দেয়। মানুষ সেগুলো পড়ছে— এটিই তাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
মুগ্ধ জানায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাদের প্ল্যাকার্ড তৈরি করতে শিখিয়েছেন এবং শিখেছেন বাস্তব জীবনে ভালো কাজের প্রয়োগ করতে। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই সে এই উদ্যোগ নিয়েছে।
তার ভাষায়, “আমার এলাকার অনেক মানুষ মাদক সেবন করে, অনেকেই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নয়। আমার লেখা দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয় বা পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসে, তাহলেই আমি নিজেকে সফল মনে করব।”
মুগ্ধের বাবা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাউদ্দৌলা বলেন, “ছেলের এই উদ্যোগের কথা আগে জানতাম না। একদিন পথে প্ল্যাকার্ড দেখে পরে জানতে পারি এগুলো ওরই লেখা। আমি খুবই আবেগাপ্লুত হয়েছি এবং সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়ে যাব।”
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, “শ্রেণিকক্ষে আমরা শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ড তৈরি শেখাই। মুগ্ধ সেই শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করেছে। তার এই উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
মুগ্ধ চায় তার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা কমুক, গাছপালা ও পাখিতে ভরে উঠুক প্রকৃতি, নদী-খাল-বিল থাকুক দূষণমুক্ত এবং সমাজ মাদকমুক্ত হোক।
পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া বলেন, “শিশুদের এমন উদ্যোগকে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন। মুগ্ধের মতো শিশুরাই ভবিষ্যতে ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে।”





















