মতিউর রহমান বীর বিক্রমের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

মতিউর রহমান বীর বিক্রমের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

১৫ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ

আল-আমিন হাসান, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৬ অক্টোবর। ২০১১ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। মৃত্যুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্য, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দারা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মতিউর রহমান ৫ নম্বর সেক্টরের বড়ছড়া সাব-সেক্টরের কোবরা কোম্পানির কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা অভিযানে অংশ নেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

মুক্তিযুদ্ধের পরও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন মতিউর রহমান। ২০১১ সালের ৬ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিকলীর পশ্চিম পুকুরপাড় এলাকায় তাঁকে দাফন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বর্তমানে তাঁর কবরটি পাকা করা হয়েছে। তবে কবরটি পাকা ও এর উন্নয়নের কাজ পরিবারের উদ্যোগেই করা হয়েছে। একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে আলাদা কোনো জায়গা সংরক্ষণ বা স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘উনার কবরটা পরিবারের পক্ষ থেকেই পাকা করা হয়েছে। কিন্তু উনার মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এখনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ আমরা দেখিনি। আমরা চাই, তাঁর স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হোক।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁর নামে নিকলীর একটি সড়ক, খেলার মাঠ ও অডিটোরিয়ামের নামকরণ, শহীদ স্মরণিকা বালিকা বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কের মোড়ে তাঁর ভাস্কর্য নির্মাণ এবং ‘বীর বিক্রম স্কয়ার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল। এ ছাড়া ‘মতিউর রহমান কল্যাণ ট্রাস্ট’ ও একটি পাঠাগার স্থাপনের প্রস্তাবও ছিল।

তবে এসব উদ্যোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন।

নিকলীর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘মতিউর রহমান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সহযোদ্ধা। তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা দরকার। পরিবারের পক্ষ থেকে কবরটি পাকা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর নামে স্থায়ী কোনো স্মারক বা সংরক্ষিত জায়গা এখনো হয়নি। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের জন্য কবরস্থানে যাতায়াতের সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। তাঁদের দাবি, সমাধিস্থলটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন।

মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগগুলোর বিষয়ে বর্তমান উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্প্রতি নিকলীতে যোগ দিয়েছেন। ফলে আগের সময়ে নেওয়া এসব উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দাদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে স্থানীয় পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দাবি, মতিউর রহমান বীর বিক্রমের নামে আগে নেওয়া উদ্যোগগুলো যাচাই করে বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাঁর সমাধিস্থল সংরক্ষণ, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন এবং একটি স্থায়ী স্মারক নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মতিউর রহমান বীর বিক্রমের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ও স্মৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের উদ্যোগগুলো এবার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর বীরত্বগাথা তুলে ধরা হবে।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
নিজস্ব জমি ও বহুতল ভবনের দাবিতে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে মানববন্ধন

নিজস্ব জমি ও বহুতল ভবনের দাবিতে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে মানববন্ধন

মতিউর রহমান বীর বিক্রমের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট সময় : ০৫:২২:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

১৫ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ

আল-আমিন হাসান, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৬ অক্টোবর। ২০১১ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। মৃত্যুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্য, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দারা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মতিউর রহমান ৫ নম্বর সেক্টরের বড়ছড়া সাব-সেক্টরের কোবরা কোম্পানির কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা অভিযানে অংশ নেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

মুক্তিযুদ্ধের পরও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন মতিউর রহমান। ২০১১ সালের ৬ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিকলীর পশ্চিম পুকুরপাড় এলাকায় তাঁকে দাফন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বর্তমানে তাঁর কবরটি পাকা করা হয়েছে। তবে কবরটি পাকা ও এর উন্নয়নের কাজ পরিবারের উদ্যোগেই করা হয়েছে। একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে আলাদা কোনো জায়গা সংরক্ষণ বা স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘উনার কবরটা পরিবারের পক্ষ থেকেই পাকা করা হয়েছে। কিন্তু উনার মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এখনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ আমরা দেখিনি। আমরা চাই, তাঁর স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হোক।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁর নামে নিকলীর একটি সড়ক, খেলার মাঠ ও অডিটোরিয়ামের নামকরণ, শহীদ স্মরণিকা বালিকা বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কের মোড়ে তাঁর ভাস্কর্য নির্মাণ এবং ‘বীর বিক্রম স্কয়ার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল। এ ছাড়া ‘মতিউর রহমান কল্যাণ ট্রাস্ট’ ও একটি পাঠাগার স্থাপনের প্রস্তাবও ছিল।

তবে এসব উদ্যোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন।

নিকলীর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘মতিউর রহমান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সহযোদ্ধা। তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা দরকার। পরিবারের পক্ষ থেকে কবরটি পাকা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর নামে স্থায়ী কোনো স্মারক বা সংরক্ষিত জায়গা এখনো হয়নি। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের জন্য কবরস্থানে যাতায়াতের সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। তাঁদের দাবি, সমাধিস্থলটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন।

মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগগুলোর বিষয়ে বর্তমান উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্প্রতি নিকলীতে যোগ দিয়েছেন। ফলে আগের সময়ে নেওয়া এসব উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দাদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে স্থানীয় পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দাবি, মতিউর রহমান বীর বিক্রমের নামে আগে নেওয়া উদ্যোগগুলো যাচাই করে বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাঁর সমাধিস্থল সংরক্ষণ, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন এবং একটি স্থায়ী স্মারক নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মতিউর রহমান বীর বিক্রমের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ও স্মৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের উদ্যোগগুলো এবার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর বীরত্বগাথা তুলে ধরা হবে।