জগন্নাথপুরে প্রয়াত নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে জটিলতা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

জগন্নাথপুরে প্রয়াত নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে জটিলতা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৬নং রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কুবাজপুর আহমদাবাদ গ্রামের কৃতী সন্তান ও বিশিষ্ট সমাজসেবক মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর বিশাল সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।

মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর মালিকানাধীন সম্পত্তির মধ্যে বাগানবাড়ি ফিশারি, কন্ট্রোলরুম ফিশারি, গফাইখালি ডহর, রাজনখালি ডহর, বালুচর ফিশারি ও ফসলি জমিসহ বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছেন। তারা হলেন—শাহ ছুবা চৌধুরী, শাহ সাহাব চৌধুরী, শাহ নেওয়াজ চৌধুরী, শাহ কুতুব চৌধুরী, শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী, ফেরদৌসী চৌধুরী, আলীমা বেগম চৌধুরী ও ফাতেমা চৌধুরী। এছাড়া একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ছেলে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম রাখা হয় মো. আব্দুল্লাহ। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী পালকপুত্র আব্দুল্লাহকে লালন-পালন করে বিয়ে-শাদির ব্যবস্থা করেন এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে সম্পত্তির মালিকানায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী ওরফে নুর চৌধুরী ১৯৯৮ সালের ২২ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণসহ দেশে একাই ভোগদখল করে আসছিলেন তার তৃতীয় ছেলে শাহ নেওয়াজ চৌধুরী। জীবিত থাকা অবস্থায় শাহ নেওয়াজ চৌধুরী গ্রামের ইয়াওর মিয়া, খলিল মিয়াসহ কয়েকজনের কাছে কয়েকটি জলমহাল লিজ দিয়েছিলেন। পরে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যুর পর ইয়াওর মিয়া ও খলিল মিয়াসহ কয়েকজন মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং এ জন্য কিছু অবৈধ কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

শাহ ছুবা চৌধুরী ও শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী তাদের পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি রক্ষার জন্য বাংলাদেশে ইউসুফ আহমেদকে ম্যানেজার এবং আফাজ চৌধুরী ও মো. এনামুল হক রেজাউল করিমকে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। তাদের নেতৃত্বে কুবাজপুর আহমদাবাদ গ্রামের আলাল মিয়া, সাফর মিয়া এবং শাহ ছুবা চৌধুরীর চাচাতো ভাই-ভাতিজাদের একত্রিত করে খলিল গংদের কাছ থেকে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ইউসুফ, আফাজ, এনামুল, আলাল, সাফর, রাহিম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলার কয়েকটি এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্পত্তি উদ্ধারের পর প্রায় এক বছর সবাই সুশৃঙ্খলভাবে মিলেমিশে ভোগদখল করে আসছিলেন। কিন্তু আফাজ চৌধুরীর দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও চলাফেরায় সন্দেহ দেখা দেওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আফাজ চৌধুরীকে কেয়ারটেকারের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তিনি শাহ ছুবা চৌধুরীর পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আফাজ চৌধুরী শাহ সাহাব চৌধুরীকে একাই বিশাল সম্পত্তির মালিক বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিজের আয়ত্তে আনেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, আফাজ চৌধুরীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে শাহ সাহাব চৌধুরী পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষ ইয়াওর, ছাতির ও খলিল গংদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুরো সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

শাহ সাহাব চৌধুরী বাংলাদেশে আসার পর সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। পরিবারের সাতজন সদস্য ওই প্রস্তাবে রাজি হলেও শাহ সাহাব চৌধুরী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাজ্যে চলে যান বলে দাবি করা হয়েছে।

পরে বাংলাদেশে তাদের চাচাতো বড় ভাই ও সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এবং লন্ডনে শাহ সাহাব চৌধুরীর ১২ জন আত্মীয়-স্বজন মিলে সম্পত্তি বণ্টনের উদ্যোগ নেন। তাদের উদ্যোগে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য রাজি হলেও শাহ সাহাব চৌধুরী কোনোভাবেই সম্পত্তি বণ্টনে রাজি হননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জালাল চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপন চাচাতো ভাই ছুবা চৌধুরী ও সাহাব চৌধুরীর সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তির স্বার্থে লন্ডন ও বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে তারা অনেক চেষ্টা করেছেন। পরিবারের সব ভাই-বোন তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও শাহ সাহাব চৌধুরীকে কোনোভাবেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। তার দেওয়া শর্তের কারণে বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।

শাহ ছুবা চৌধুরীর চাচাতো ভাই ফারকাছ মিয়া বলেন, “পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আমি উপস্থিত ছিলাম। এসপি স্যার শাহ সাহাব চৌধুরীকে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।”

রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আতাউর রহমান মিলাদ মিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি মীমাংসার জন্য অনেকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। পরিবারের সকল সদস্য সম্পত্তি বণ্টন করতে চাইলেও শাহ সাহাব চৌধুরীর দেওয়া শর্তের কারণে বিষয়টি মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি।”

এ বিষয়ে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী, মরহুম শাহ কুতুব চৌধুরীর ছেলে ইফতিকার জামান চৌধুরী, আলীমা চৌধুরী ও ফাতেমা চৌধুরীর পক্ষ থেকে শাহ ছুবা চৌধুরী বলেন, “আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। সবাই লন্ডনে বসবাস করি। আমাদের দুই ভাই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের বাবা মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি শাহ নেওয়াজ চৌধুরী দীর্ঘদিন দেশে দেখাশোনা করতেন। হঠাৎ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আমরা ভাই-বোনেরা একত্রিত হয়ে আমাদের পিতার সম্পত্তি ইসলামী ও সরকারি আইন অনুযায়ী ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে চাই। তবে আমার ভাই সাহাব সম্পত্তি বণ্টন করতে চান না। তার উদ্দেশ্য একাই বিশাল সম্পত্তি ভোগদখল করা।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা আমাদের দুই ভাইকে ২০ কেয়ার জমি অতিরিক্ত দিতে রাজি হয়েছি। এখন আফাজ আমার ভাই সাহাবকে সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষ খলিল, ছাতির ও ইয়াওরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি বাহিনী তৈরি করে পুরো সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে।”

প্রবাসী পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সম্পত্তি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শাহ সাহাব চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান পীর বলেন, “আমি জগন্নাথপুর থানাধীন কুবাজপুর গ্রামের মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে বর্তমানে মরহুম শাহ নেওয়াজ চৌধুরী ও আকিব চৌধুরী গংয়ের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে আছি। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী মৃত্যুকালে এক স্ত্রী, পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা রেখে যান। পরবর্তীতে তার স্ত্রী মিসেস নেহেরুন চৌধুরীও মৃত্যুবরণ করেন।”

তিনি আরও বলেন, “শাহ নুর মিয়া চৌধুরী ও তার স্ত্রী নেহেরুন চৌধুরীর সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে আমার লিগ্যাল ওপিনিয়ন হলো, মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ সম্পত্তি পায় এবং প্রত্যেক মেয়ে প্রত্যেক ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। আইন অনুযায়ী এটাই আমার মতামত।”

কুবাজপুর গ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইয়াওর মিয়া, খলিল মিয়াসহ কয়েকজনের দখলে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি ছিল বলে তারা জানেন। তাদের কাছ থেকে পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য শাহ ছুবা চৌধুরী, শাহ সাহাব চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা হামলা-মামলাসহ বিপুল অর্থ ব্যয় করে সম্পত্তি উদ্ধার করেন বলে তারা দাবি করেন।

তাদের অভিযোগ, প্রায় এক বছর পর আফাজ চৌধুরী শাহ সাহাব চৌধুরীকে সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করছেন এবং সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন।

এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। সংঘর্ষ এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি আওলাই ইউনিয়নের শিরতা গ্রামে এন এস আই তথ্যের ভিত্তিতে রমজানের বাসা থেকে ৭৬ বস্তা সার উদ্ধার

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি আওলাই ইউনিয়নের শিরতা গ্রামে এন এস আই তথ্যের ভিত্তিতে রমজানের বাসা থেকে ৭৬ বস্তা সার উদ্ধার

জগন্নাথপুরে প্রয়াত নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে জটিলতা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

আপডেট সময় : ০৭:৫৫:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৬নং রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কুবাজপুর আহমদাবাদ গ্রামের কৃতী সন্তান ও বিশিষ্ট সমাজসেবক মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর বিশাল সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।

মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর মালিকানাধীন সম্পত্তির মধ্যে বাগানবাড়ি ফিশারি, কন্ট্রোলরুম ফিশারি, গফাইখালি ডহর, রাজনখালি ডহর, বালুচর ফিশারি ও ফসলি জমিসহ বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছেন। তারা হলেন—শাহ ছুবা চৌধুরী, শাহ সাহাব চৌধুরী, শাহ নেওয়াজ চৌধুরী, শাহ কুতুব চৌধুরী, শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী, ফেরদৌসী চৌধুরী, আলীমা বেগম চৌধুরী ও ফাতেমা চৌধুরী। এছাড়া একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ছেলে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম রাখা হয় মো. আব্দুল্লাহ। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী পালকপুত্র আব্দুল্লাহকে লালন-পালন করে বিয়ে-শাদির ব্যবস্থা করেন এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে সম্পত্তির মালিকানায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী ওরফে নুর চৌধুরী ১৯৯৮ সালের ২২ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণসহ দেশে একাই ভোগদখল করে আসছিলেন তার তৃতীয় ছেলে শাহ নেওয়াজ চৌধুরী। জীবিত থাকা অবস্থায় শাহ নেওয়াজ চৌধুরী গ্রামের ইয়াওর মিয়া, খলিল মিয়াসহ কয়েকজনের কাছে কয়েকটি জলমহাল লিজ দিয়েছিলেন। পরে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যুর পর ইয়াওর মিয়া ও খলিল মিয়াসহ কয়েকজন মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং এ জন্য কিছু অবৈধ কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

শাহ ছুবা চৌধুরী ও শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী তাদের পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি রক্ষার জন্য বাংলাদেশে ইউসুফ আহমেদকে ম্যানেজার এবং আফাজ চৌধুরী ও মো. এনামুল হক রেজাউল করিমকে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। তাদের নেতৃত্বে কুবাজপুর আহমদাবাদ গ্রামের আলাল মিয়া, সাফর মিয়া এবং শাহ ছুবা চৌধুরীর চাচাতো ভাই-ভাতিজাদের একত্রিত করে খলিল গংদের কাছ থেকে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ইউসুফ, আফাজ, এনামুল, আলাল, সাফর, রাহিম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলার কয়েকটি এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্পত্তি উদ্ধারের পর প্রায় এক বছর সবাই সুশৃঙ্খলভাবে মিলেমিশে ভোগদখল করে আসছিলেন। কিন্তু আফাজ চৌধুরীর দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও চলাফেরায় সন্দেহ দেখা দেওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আফাজ চৌধুরীকে কেয়ারটেকারের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তিনি শাহ ছুবা চৌধুরীর পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আফাজ চৌধুরী শাহ সাহাব চৌধুরীকে একাই বিশাল সম্পত্তির মালিক বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিজের আয়ত্তে আনেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, আফাজ চৌধুরীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে শাহ সাহাব চৌধুরী পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষ ইয়াওর, ছাতির ও খলিল গংদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুরো সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

শাহ সাহাব চৌধুরী বাংলাদেশে আসার পর সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। পরিবারের সাতজন সদস্য ওই প্রস্তাবে রাজি হলেও শাহ সাহাব চৌধুরী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাজ্যে চলে যান বলে দাবি করা হয়েছে।

পরে বাংলাদেশে তাদের চাচাতো বড় ভাই ও সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এবং লন্ডনে শাহ সাহাব চৌধুরীর ১২ জন আত্মীয়-স্বজন মিলে সম্পত্তি বণ্টনের উদ্যোগ নেন। তাদের উদ্যোগে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য রাজি হলেও শাহ সাহাব চৌধুরী কোনোভাবেই সম্পত্তি বণ্টনে রাজি হননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জালাল চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপন চাচাতো ভাই ছুবা চৌধুরী ও সাহাব চৌধুরীর সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তির স্বার্থে লন্ডন ও বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে তারা অনেক চেষ্টা করেছেন। পরিবারের সব ভাই-বোন তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও শাহ সাহাব চৌধুরীকে কোনোভাবেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। তার দেওয়া শর্তের কারণে বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।

শাহ ছুবা চৌধুরীর চাচাতো ভাই ফারকাছ মিয়া বলেন, “পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আমি উপস্থিত ছিলাম। এসপি স্যার শাহ সাহাব চৌধুরীকে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।”

রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আতাউর রহমান মিলাদ মিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি মীমাংসার জন্য অনেকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। পরিবারের সকল সদস্য সম্পত্তি বণ্টন করতে চাইলেও শাহ সাহাব চৌধুরীর দেওয়া শর্তের কারণে বিষয়টি মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি।”

এ বিষয়ে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে শাহ ইদুজ্জোহা চৌধুরী, মরহুম শাহ কুতুব চৌধুরীর ছেলে ইফতিকার জামান চৌধুরী, আলীমা চৌধুরী ও ফাতেমা চৌধুরীর পক্ষ থেকে শাহ ছুবা চৌধুরী বলেন, “আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। সবাই লন্ডনে বসবাস করি। আমাদের দুই ভাই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের বাবা মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি শাহ নেওয়াজ চৌধুরী দীর্ঘদিন দেশে দেখাশোনা করতেন। হঠাৎ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আমরা ভাই-বোনেরা একত্রিত হয়ে আমাদের পিতার সম্পত্তি ইসলামী ও সরকারি আইন অনুযায়ী ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে চাই। তবে আমার ভাই সাহাব সম্পত্তি বণ্টন করতে চান না। তার উদ্দেশ্য একাই বিশাল সম্পত্তি ভোগদখল করা।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা আমাদের দুই ভাইকে ২০ কেয়ার জমি অতিরিক্ত দিতে রাজি হয়েছি। এখন আফাজ আমার ভাই সাহাবকে সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষ খলিল, ছাতির ও ইয়াওরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি বাহিনী তৈরি করে পুরো সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে।”

প্রবাসী পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সম্পত্তি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শাহ সাহাব চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান পীর বলেন, “আমি জগন্নাথপুর থানাধীন কুবাজপুর গ্রামের মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর ছেলে বর্তমানে মরহুম শাহ নেওয়াজ চৌধুরী ও আকিব চৌধুরী গংয়ের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে আছি। শাহ নুর মিয়া চৌধুরী মৃত্যুকালে এক স্ত্রী, পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা রেখে যান। পরবর্তীতে তার স্ত্রী মিসেস নেহেরুন চৌধুরীও মৃত্যুবরণ করেন।”

তিনি আরও বলেন, “শাহ নুর মিয়া চৌধুরী ও তার স্ত্রী নেহেরুন চৌধুরীর সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে আমার লিগ্যাল ওপিনিয়ন হলো, মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ সম্পত্তি পায় এবং প্রত্যেক মেয়ে প্রত্যেক ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। আইন অনুযায়ী এটাই আমার মতামত।”

কুবাজপুর গ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইয়াওর মিয়া, খলিল মিয়াসহ কয়েকজনের দখলে মরহুম শাহ নুর মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি ছিল বলে তারা জানেন। তাদের কাছ থেকে পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য শাহ ছুবা চৌধুরী, শাহ সাহাব চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা হামলা-মামলাসহ বিপুল অর্থ ব্যয় করে সম্পত্তি উদ্ধার করেন বলে তারা দাবি করেন।

তাদের অভিযোগ, প্রায় এক বছর পর আফাজ চৌধুরী শাহ সাহাব চৌধুরীকে সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে পূর্বের বিরোধপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করছেন এবং সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন।

এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। সংঘর্ষ এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।