ছাইদুর রহমান নাঈম, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলীয় অবস্থান ও বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফের আলোচনায় এসেছেন তিনি।
বিএনপি থেকে পাঁচবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন সাবেক এই সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনের সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করেন। দলে গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে নেই তিনি, তবে দলটির বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কার্যক্রমে সামনের সারিতে দেখা যায় তাকে। তাঁর এই দলবদল সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করে।
সম্প্রতি বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
এ ঘটনায় তাঁর নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতেও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন সাহসী আবার তার অতীত রাজনৈতিক দলের লোকজনের মতে তিনি দন্তহীন বাঘ৷ কারো মতে তিনি বহুরূপী। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়েছে আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে কটিয়াদী ও কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।
কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মোজাম্মেল হক জোয়ারদার বলেন, ‘আখতারুজ্জামান প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে জোরালো আওয়াজ তোলার কারণেই প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। দেশে ও প্রবাসে অনেক মানুষ তাঁর সাহসী প্রতিবাদী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। সমস্যা দূর না করে প্রতিবাদকারীকে গ্রেফতার নিন্দনীয়৷ এই ঘটনা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। অবিলম্বে তাঁর মুক্তি চাই।’
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন বলেন, ‘তিনি কখন কী বলেন, তার ঠিক নেই। তাঁর বক্তব্য অনেক সময়ই বিতর্ক তৈরি করে। অতীতে তাঁর কর্মকাণ্ডও বিতর্কিত ছিল। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পাতানো নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। রাজনীতিতে তিনি বহুরূপী হিসেবে পরিচিত। বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটি যথাযথ।’
উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মোড়ল বলেন, ‘অবিলম্বে আমরা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। তিনি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো নিয়ে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করেছেন। স্বাধীন দেশের নাগরিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি তাঁর মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মুক্তি না হলে প্রবাসীরাও আন্দোলনে যুক্ত হতে পারেন।’
উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম সেতু বলেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনে আখতারুজ্জামান অংশ নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক কারণে এখন তিনি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তিনি মূলত দন্তহীন বাঘ। সবসময়ই মিডিয়ায় আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন৷ জামায়াতের সহযোগী সদস্য বলা হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর বিচরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি ইমন, আশরাফুল ও আহমেদ সোবহান বলেন, ‘বিমানবন্দরে নানা অনিয়ম ও লাগেজ নিয়ে সমস্যা দীর্ঘদিনের। অনেক সময় সঠিকভাবে মালপত্র পাওয়া যায় না এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান যেভাবে প্রতিবাদ করেছেন, আমরা সেটিকে সাহসী বক্তব্য মনে করি। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে হয়তো কিছুটা উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ করেছেন। আমরা তাঁর মুক্তি চাই।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনী রাজনীতিতে আখতারুজ্জামান ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আখতারুজ্জামান। তিনি ১৬ হাজার ১৯৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন এবং জামানত হারান।
এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে কটিয়াদী আসন থেকে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সে সময় আসনটি শুধু কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল। পরে এর সঙ্গে পাকুন্দিয়া উপজেলা যুক্ত হয়। তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
দলীয় শৃঙ্খলা-পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তাঁকে দলটির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি দল থেকে আরও কয়েকবার বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকলেও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যুতে টেলিভিশন টক শো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি করেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।



















