নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
জেলায় গত সাত বছরে শুধু বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৭৯ জনের। জেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে বিশেষ করে হাওর জনপদে বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য নেই বাস্তব কার্যকর পদক্ষেপ। ইতোমধ্যে জেলার হাওরাঞ্চলে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের বেশিরভাগ অকেজো হয়ে গেছে। এর বিকল্প হিসেবে তালগাছ রোপণের প্রকল্পও সফলতার মুখ দেখেনি।
জেলার মোহনগঞ্জ,মদন,খালিয়াজুরী এলাকা জুড়ে রয়েছে বিশাল অগণিত হাওর,বাওর ও বিলের উন্মুক্ত অঞ্চল।এসব এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী মানুষ কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু চরানো ও হাঁস পালন যাদের প্রধান পেশা।এসব মানুষ প্রকৃতির হাতের পুতুলের মতো জীবনযাপন করছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাতেই বাধ্য হয়ে প্রাণ দিতে হয় অনেকের।
এসব অঞ্চলে জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড় বৃষ্টির মৌসুমে চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। এসময় বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে কৃষকেরা অনেক সময় মাঠে যেতে ভয় পান। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় প্রাণহানির খবর। বাস্তবে কাজের কাজ কিছু হয়নি এখন পর্যন্ত। সচেতন মহলের প্রশ্ন এভাবে আর কত প্রাণ দিতে হবে এ এলাকার অসহায় কর্মজীবী মানুষের!
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন তথ্য অনুযায়ী, জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়ে মরণঘাতী বজ্রপাতে ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জনের প্রাণ দিতে হয়েছে।২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন অন্তত ১৭ জন। হাওর অঞ্চলের মানুষের দাবি, প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
জেলার হাওর অঞ্চলে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে
খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের ইছাক মিয়ার ছেলে শফিকুল মিয়া বাড়ির সামনের হাওরে হাঁস আনতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। তার হাস পালন করে জীবিকা নির্বাহের দীর্ঘদিনের আশা পূরণ হয়নি।এক নিমিষেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি তার জীবনের স্বপ্ন ও সাধ।
সর্বনাশা বজ্রপাতের কারণে যাতে মানুষ মারা না যায় এজন্য ২০২২ সালে নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। এতে বিশেষ করে হাওর পাড়ের কৃষকরা অনেকটা আশা খুঁজে পেতে চেয়েছিল।জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় ৩২টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়। একেকটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় হয়েছিল ছয় থেকে আট লাখ টাকা।
আধুনিক প্রযুক্তি অনুযায়ী, বজ্রনিরোধক দণ্ড হাওর বা খোলা উন্মুক্ত ক্ষেত ও ময়দানে স্থাপন করা হলে এর সুফল অনেক। বাস্তবে হয়েছে উল্টো।হাওর পাড়ের জনগণের অভমত হচ্ছে, এসব অধিকাংশ দণ্ড বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। ফলে স্থাপনের কিছু দিন পর নজরদারির অভাবে অনেক দণ্ড অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক আবার যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। কোনো কোনো স্থানে দণ্ডগুলো এখন শুধু খুঁটির মত সাক্ষী হয়ে আছে।
খালিয়াজুরী উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক সুনীল তালুকদার,মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলাম,,মোহনগঞ্জের আদর্শনগর গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, লোকালয়ের কাছে বেশিরভাগ বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে হাওরের ফাঁকা জায়গায় এগুলো স্থাপন করা হলে জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে খোলা মাঠে বা হাওরে গেলে দুর্যোগে বজ্রপাতের হাত থেকে রেহাই পেত।
বজ্রপাতের মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেতে দ্বিতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাওর অঞ্চলে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ২০১৮ সালে নেত্রকোনাতেও এ প্রকল্পের আওতায় তালগাছের চারা রোপণ করা হয়।এসব গাছ রোপণের পর চারাগুলোতে পানি দেয়া হয়নি।পানির অভাবে ফলে বেশির ভাগ চারা মারা গেছে। সরকারি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এ পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে।
মোহনগঞ্জের আদর্শ নগর গ্ৰামের অজিত মিয়া বলেন, আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে পারে অনেকাংশে।এসব তালগাছের বাকলে কার্বনের স্তর থাকায় বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় এটি ভূমিকা রাখতে পারে। পাঁচ ছয় বছর আগে সারা দেশের মতো নেত্রকোনাতেও তালগাছ রোপণ করা হয়। নজরদারির অভাবে এখন এসব গাছ মরে গেছে।
খালিয়াজুরি উপজেলা সদরের বাসিন্দা বিজয় সরকার বলেন, মানুষের জীবন রক্ষায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে বজ্রপাতে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।এর সুফল পেতে উন্মুক্ত হাওরের বিভিন্ন স্থানে তালগাছ লাগানো প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগে স্থানীয় লোকজনকে পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, বিভিন্ন উপজেলার হাওর অঞ্চলে ফসলের মাঠ, বিল ও ফাঁকা জায়গায় ৩৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। এতে দণ্ডে বিশেষ ধরনের ম্যাগনেট রয়েছে, যা ৩০০ ফুট এলাকা কভার করতে পারে। সম্প্রতি আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকল্প হিসেবে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন রয়েছে।এলাকায় বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে লোকজন এতে আশ্রয় নিতে পারবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, প্রতি বছর জেলার হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে। হাওরাঞ্চলের মানুষকে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বজ্রপাতের সময় যাতে মানুষ দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।



















