উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয় প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুক্রবার (২ অক্টোবর) সারাদেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস-২০২৬।
দিবসটি উপলক্ষে দিনাজপুর সদর উপজেলার হুগলীপাড়া গ্রামের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্যোগে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি ‘রাইস গার্ডেন’, যেখানে একসঙ্গে আবাদ করা হয়েছে ব্রি উদ্ভাবিত ৫২টি ধানের জাত। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ ও কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামটি এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘প্রযুক্তিগ্রাম’ হিসেবে।
ব্রির এলএসটিডি (LSTD) প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলা এই রাইস গার্ডেনটি দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এখানে আমন ও বোরো মৌসুম উপযোগী বিভিন্ন উন্নত জাতের ধান সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি প্লটের সামনে সংশ্লিষ্ট ধানের জাত, বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা সহজেই বিভিন্ন জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
রাইস গার্ডেনটি দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ভিড় করছেন। একই মাঠে ৫২টি ধানের জাতের বৃদ্ধি, শীষের গঠন, রোগবালাই সহনশীলতা এবং সম্ভাব্য ফলন পর্যবেক্ষণ করে তারা নিজেদের জমির জন্য উপযুক্ত জাত নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে বিভিন্ন জাতের ধান সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত ছিল। এখন একই স্থানে সব জাতের ধান দেখে কোনটি কত দিনে পরিপক্ব হয় এবং কোনটি এলাকার জন্য বেশি উপযোগী তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তারা বলেন, ভালো ফলন ও গুণগত মানের জাতগুলো ভবিষ্যতে চাষের পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি ব্রির পক্ষ থেকে বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করায় নতুন জাতের ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।
ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, দিনাজপুরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, “উৎপাদনশীলতা বলতে শুধু ফলন বৃদ্ধি নয়; বরং সঠিক বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তিগ্রামের মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেওয়া হচ্ছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন জানান, সারাদেশের ১৫টি গ্রামকে প্রযুক্তিগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি বলেন, “স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি কৃষকদের কাছে এসব প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য। ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় নতুন কয়েকটি ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, হুগলীপাড়ার এই রাইস গার্ডেন শুধু নতুন ধানের জাত পরিচিতির ক্ষেত্র নয়, বরং কৃষকদের হাতে-কলমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি শেখানোর একটি কার্যকর মডেল। এর মাধ্যমে দিনাজপুরে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষির আধুনিকায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।



















