গাইবান্ধা প্রতিনিধি
সারাজীবন পুলিশের পোশাক পরে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছেন রাষ্ট্রের সেবায়। অবসরের পর স্বপ্ন ছিল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শান্তিতে শেষ জীবন কাটানোর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ ভেঙে চুরমার। স্ত্রীকে হারানোর পর অসুস্থতার সুযোগে ছেলে তার সম্পত্তি লিখে নিয়েছে এবং পরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে—এমন অভিযোগ করে এখন বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিয়েছেন সাবেক পুলিশ সদস্য মো. আফজাল হোসেন (৭২)।
আফজাল হোসেনের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায়। বর্তমানে তিনি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের ছোট সোহাগী গ্রামের মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন। সেখানে আরও ৩৮ জন অসহায় ও অবহেলিত মা-বাবার সঙ্গে কাটছে তার জীবনের শেষ অধ্যায়।
আফজাল হোসেন জানান, চাকরি থেকে অবসরের পর স্ত্রীকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। প্রায় চার বছর আগে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় ছেলে কৌশলে তার সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, সম্পত্তি হস্তান্তরের পর থেকেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। আশ্রয় নেন বৃদ্ধাশ্রমে।
বৃদ্ধাশ্রমের একটি কক্ষে বসে আফজাল হোসেন বলেন, “জীবনের দীর্ঘ সময় মানুষের সেবা করেছি। ভেবেছিলাম শেষ বয়সে নিজের ঘরে শান্তিতে থাকব। কিন্তু স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সবকিছু বদলে গেল। এখন এই বৃদ্ধাশ্রমই আমার শেষ ঠিকানা।”
তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস, চোখে ছিল না বলা অসংখ্য বেদনার ছাপ।
শুধু আফজাল হোসেন নন, মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া আরও অনেক প্রবীণের জীবনও স্বজনদের অবহেলা, একাকিত্ব ও বঞ্চনার গল্পে ভরা। কারও সন্তান নেই, আবার কারও সন্তান থাকলেও তারা মা-বাবার খোঁজখবর নেন না বলে জানিয়েছেন আশ্রম কর্তৃপক্ষ।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. আপেল মাহমুদ জানান, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর মানবিক উদ্যোগ হিসেবে মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার দাবি, গাইবান্ধার সাত উপজেলার মধ্যে এটিই একমাত্র বৃদ্ধাশ্রম। বর্তমানে এখানে ৩৯ জন মা-বাবা আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, “অনেক মা-বাবা আছেন, যাদের জীবনের শেষ সময়ে পাশে থাকার কেউ নেই। তাদের জন্য এই আশ্রমই এখন পরিবার।”
স্বজনদের অবহেলায় বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া এসব প্রবীণের জীবনকাহিনি সমাজের কাছে এক নীরব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যারা সন্তানদের বড় করতে জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন, শেষ বয়সে তাদের স্থান কি সত্যিই বৃদ্ধাশ্রম?




















