আল-আমিন হাসান, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পানি ও কৃষি। বর্ষায় হাওর পানিতে ভরে উঠলে মাছ ধরাই হয়ে ওঠে স্থানীয় জেলেদের প্রধান জীবিকা। আর পানি শুকিয়ে গেলে সেই হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। এভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বছরের পর বছর জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন উপজেলার হাজারো মানুষ।
সাধারণত আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত নিকলীর হাওর ও নিম্নাঞ্চলে পানি থাকে। এ সময় নৌকা ও জাল নিয়ে হাওরে ছুটে যান জেলেরা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরেন তারা। বর্ষার এই কয়েক মাসই তাদের কাছে মাছ ধরার প্রধান মৌসুম।
নিকলী উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৯ হাজার ২১৮ জন। হাওরের মাছের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল রয়েছে বিপুলসংখ্যক পরিবার।
স্থানীয় জেলেরা জানান, একসময় বর্ষা মৌসুমে হাওরের বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ তুলনামূলক বেশি পাওয়া যেত। বর্তমানে অনেক এলাকায় মাছের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে মাছ ধরার মৌসুমে প্রত্যাশিত আয় না হলে সংসার চালাতে তাদের বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয়।
দামপাড়া এলাকার এক জেলে বলেন, “পানি থাকলে আমরা মাছ ধরি। এই সময়টাতেই আমাদের মূল আয় হয়। কিন্তু আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। সারাদিন হাওরে থেকেও অনেক সময় তেমন মাছ পাওয়া যায় না।”
জেলেদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, ছোট মাছ ও মা-মাছ আহরণসহ বিভিন্ন কারণে হাওরের দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমছে। এতে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত মানুষের আয়েও প্রভাব পড়ছে।
তবে নিকলীর জেলেদের জীবিকা শুধু মাছ ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কার্তিক মাসের পর পানি কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে যায়। উন্মুক্ত হয়ে পড়ে কৃষিজমি। তখন অনেক জেলে মাছ ধরার পেশা ছেড়ে কৃষিকাজে যুক্ত হন।
বোরো মৌসুমে ধান চাষের সময় তারা জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, পরিচর্যা ও ধান কাটার কাজে যুক্ত হন। ফলে নিকলীর অনেক পরিবারের জীবিকা মূলত দুই মৌসুমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে—বর্ষায় মাছ ধরা এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ।
একজন জেলে বলেন, “পানি থাকলে মাছ ধরি, পানি শুকিয়ে গেলে কৃষিকাজ করি। আমাদের জীবন হাওরের পানির সঙ্গে জড়িত। বর্ষায় মাছ ভালো পাওয়া গেলে সংসার চালাতে সুবিধা হয়।”
স্থানীয়দের মতে, হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা গেলে জেলেদের পাশাপাশি পুরো এলাকার অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাওরের পানি ও জমির এই মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলছে নিকলীর জেলেদের জীবন। বর্ষায় নৌকা ও জাল তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন; আর পানি শুকিয়ে গেলে সেই হাওরের জমিই হয়ে ওঠে তাদের কর্মক্ষেত্র



















