বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

মীর মো. রাকিব হাসান, বগুড়া

বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালত শেষ ভরসার জায়গা। বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে একজন মানুষ যখন আদালতে আসেন, তাঁর প্রত্যাশা একটাই—নির্ধারিত সময়ে শুনানি হবে, আইনি প্রক্রিয়া এগোবে এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার মিলবে। কিন্তু বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিরোধে সেই প্রত্যাশাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
নতুন জেলা ও দায়রা জজ মো. মনিরুজ্জামানের পদায়নকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের একাংশের আপত্তি, পদায়ন বাতিলের দাবি, আদালত বর্জন এবং এজলাসে উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর যোগদানের দিন থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় আদালত প্রাঙ্গণে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা ও হট্টগোলের খবর এসেছে।
আইনজীবীদের একাংশ বিচারকের পূর্ববর্তী দায়িত্বকাল নিয়ে আপত্তি তুলে পদায়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক পক্ষ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে একই আদালতে এখন মতপার্থক্য স্পষ্ট। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা পদায়ন বহাল বা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সমস্যার সবচেয়ে বড় দিকটি হলো—এই বিরোধের প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থীদের ওপর। বাদী, বিবাদী, আসামি, সাক্ষী কিংবা তাঁদের স্বজনদের কাছে কে কোন পক্ষের, সেটি মুখ্য নয়। তাঁদের প্রশ্ন একটাই—“আমার মামলার শুনানি কবে হবে?”
একটি শুনানি পিছিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি তারিখ পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে যাতায়াতের খরচ, আইনজীবীর পারিশ্রমিক, কর্মদিবসের ক্ষতি এবং দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক চাপ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার ক্ষেত্রে প্রতিটি নতুন তারিখ একজন বিচারপ্রার্থীর কাছে নতুন করে অপেক্ষার বোঝা।
এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিচারকের পদায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে; কিন্তু ততদিন বিচারিক কার্যক্রম কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়?
আইনজীবীদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাইও হতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের পরিবেশ শান্ত রাখা এবং বিচারপ্রার্থীদের মামলার কার্যক্রম চালু রাখার উদ্যোগও জরুরি।
কারণ বিচারক বদলি হতে পারেন, আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একজন বিচারপ্রার্থীর হারানো সময় আর ফিরে আসে না।
বগুড়া আদালতের বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান তাই কোনো পক্ষের জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়। বিচারপ্রার্থীর অধিকার, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং মানুষের আইনের প্রতি আস্থা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই দ্রুত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান প্রয়োজন।
বগুড়ার মানুষ আদালতে দ্বন্দ্ব দেখতে চান না। তাঁরা চান আদালত সচল থাকুক, মামলার শুনানি হোক এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত হোক।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

আপডেট সময় : ০৫:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মীর মো. রাকিব হাসান, বগুড়া

বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালত শেষ ভরসার জায়গা। বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে একজন মানুষ যখন আদালতে আসেন, তাঁর প্রত্যাশা একটাই—নির্ধারিত সময়ে শুনানি হবে, আইনি প্রক্রিয়া এগোবে এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার মিলবে। কিন্তু বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিরোধে সেই প্রত্যাশাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
নতুন জেলা ও দায়রা জজ মো. মনিরুজ্জামানের পদায়নকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের একাংশের আপত্তি, পদায়ন বাতিলের দাবি, আদালত বর্জন এবং এজলাসে উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর যোগদানের দিন থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় আদালত প্রাঙ্গণে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা ও হট্টগোলের খবর এসেছে।
আইনজীবীদের একাংশ বিচারকের পূর্ববর্তী দায়িত্বকাল নিয়ে আপত্তি তুলে পদায়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক পক্ষ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে একই আদালতে এখন মতপার্থক্য স্পষ্ট। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা পদায়ন বহাল বা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সমস্যার সবচেয়ে বড় দিকটি হলো—এই বিরোধের প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থীদের ওপর। বাদী, বিবাদী, আসামি, সাক্ষী কিংবা তাঁদের স্বজনদের কাছে কে কোন পক্ষের, সেটি মুখ্য নয়। তাঁদের প্রশ্ন একটাই—“আমার মামলার শুনানি কবে হবে?”
একটি শুনানি পিছিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি তারিখ পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে যাতায়াতের খরচ, আইনজীবীর পারিশ্রমিক, কর্মদিবসের ক্ষতি এবং দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক চাপ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার ক্ষেত্রে প্রতিটি নতুন তারিখ একজন বিচারপ্রার্থীর কাছে নতুন করে অপেক্ষার বোঝা।
এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিচারকের পদায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে; কিন্তু ততদিন বিচারিক কার্যক্রম কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়?
আইনজীবীদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাইও হতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের পরিবেশ শান্ত রাখা এবং বিচারপ্রার্থীদের মামলার কার্যক্রম চালু রাখার উদ্যোগও জরুরি।
কারণ বিচারক বদলি হতে পারেন, আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একজন বিচারপ্রার্থীর হারানো সময় আর ফিরে আসে না।
বগুড়া আদালতের বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান তাই কোনো পক্ষের জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়। বিচারপ্রার্থীর অধিকার, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং মানুষের আইনের প্রতি আস্থা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই দ্রুত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান প্রয়োজন।
বগুড়ার মানুষ আদালতে দ্বন্দ্ব দেখতে চান না। তাঁরা চান আদালত সচল থাকুক, মামলার শুনানি হোক এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত হোক।