আনোয়ারুল ইসলাম রনি রংপুর
বিদ্যুৎ আদালতের একটি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য রফিকুল ইসলাম দুলালকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরদিনই আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযগে করা দুটি মামলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরও একটি মামলা থাকার তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদেরের বিরুদ্ধে।
রফিকুল ইসলাম দুলাল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রংপুর মহানগরের সদস্য। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে নগরীর নিসবেতগঞ্জ এলাকা থেকে দুলালকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। বিদ্যুৎ আদালতের একটি মামলার পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে জামিন মঞ্জুর হয়। জামিন পাওয়ার পর তিনি আবারও আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুর নগরীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা দুটি পৃথক মামলায় রফিকুল ইসলাম দুলাল এজাহারভুক্ত আসামি।
এর মধ্যে নগরীর কেরানীপাড়ার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বাপ্পি গত বছরের ১৪ মার্চ কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় দুলালকে ৪৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে নগরীর সুপার মার্কেটের সামনের সড়কে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
অন্য মামলাটি দায়ের করেন নগরীর মুলাটোল এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী। গত বছরের ৯ মে দায়ের করা ওই মামলায় রফিকুল ইসলাম দুলাল ১২৯ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে নগরীর কৈলাশরঞ্জন হাই স্কুল মোড়সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করা হয়।
এ ছাড়া চলতি বছরের ২১ আগস্ট নগরীর সিওবাজার কেল্লাবন্দ এলাকায় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের উপস্থিতির খবর পেয়ে বৈঠকে থাকা নেতাকর্মীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় ২৮ আগস্ট কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মজিবর রহমান বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলাতেও দুলালকে ৩৩ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর দুলাল গ্রেপ্তার হলেও একদিনের মধ্যেই জামিন পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যুবদল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহম্মদ ইমতি বলেন, ‘জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর যারা নৃশংস হামলা চালিয়েছে, তাদের একজন আওয়ামী লীগ নেতা দুলালকে বিচারের বাইরে রাখা বা লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশসহ যারাই জড়িত, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ সেখানে পৌঁছে যেত। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের আসামি একজন আওয়ামী লীগ নেতা এত দ্রুত সময়ের মধ্যে কীভাবে জামিন পেয়ে গেল, সেটাই এখন প্রশ্ন।’
তবে মামলা আড়াল করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোতোয়ালি থানার ওসি এ কে এম নাজমুল কাদের। তিনি বলেন, ‘ওই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর সিডিএমএসে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই বিদ্যুৎ আদালতের ওই মামলাতেই চালান দেওয়া হয়েছে। মামলা গোপনের অভিযোগ সত্য নয়।’
ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ। মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। আজ (রোববার) থেকে কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার শেষ দিন। তদন্ত শেষে কমিটি এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে।’



















