সৌন্দর্যের মায়ারূপে বিশ্বের তৃতীয় সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পর্যটকরা সাধারণত ছোটেন ভারতের সিকিম কিংবা নেপালের তাপ্লেজুংয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় ভিনদেশের এই পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যেন এক পরম ভাগ্যের ব্যাপার। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরের ‘হিমালয় কন্যা’ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাই পাখির মতো মেলা বসে পর্যটকদের।
মেঘ-রোদের লুকোচুরি ও রঙের জাদু
কাঞ্চনজঙ্ঘা সবসময় দেখা দেয় না। বর্ষার শেষে আশ্বিনের নীল আকাশে মেঘের ঘনঘটা কাটলেই উঁকি দেয় এই শ্বেতশুভ্র মহানায়ক। স্থানীয়দের কাছে এটি প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য হলেও পর্যটকদের কাছে এটি এক ‘সৌন্দর্যের ম্যাজিক’। মেঘের কোলে রোদ-কুয়াশার সাথে খেলতে খেলতে পর্বতটি প্রথমে কালচে, এরপর ক্রমান্বয়ে লাল টকটকে, কমলা, হলুদ এবং শেষে ধবধবে সাদা রঙ ধারণ করে। ভোরের প্রথম কিরণ যখন চূড়া স্পর্শ করে, তখন মনে হয় পাহাড়টি যেন উত্তপ্ত লাভার মতো জ্বলছে।
কতটা কাছে এই পাহাড়?
ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সরাসরি দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। যে কারণে এখান থেকে হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া যতটা স্পষ্ট দেখা যায়, তা ভারতের শিলিগুড়ি থেকেও সম্ভব নয়। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের দূরত্ব ৬১ কি.মি. এবং ভুটান মাত্র ৬৪ কি.মি. দূরে। এমন চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই তেঁতুলিয়া এখন দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
রাতের মায়া ও ভারতের আলোকচ্ছটা
দিনের কাঞ্চনজঙ্ঘা যেমন বিমোহিত করে, রাতের তেঁতুলিয়াও ঠিক তেমনি রহস্যময়। মেঘমুক্ত রাতের আকাশে ডাকবাংলোর তীর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় ভারতের কালিম্পং ও দার্জিলিং শহরের বৈদ্যুতিক আলো এবং ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সার্চলাইটের ঝলকানি।
সমতলের চা বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দার চরে দাঁড়ালে মনে হয় আপনি অন্য কোনো এক জগতে আছেন।
বদলে যাওয়া অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্প
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তেঁতুলিয়ার গ্রামগুলো এখন আর অবহেলিত জনপদ নয়, বরং একেকটি সমতলের চা বাগান ঘেরা পর্যটন কেন্দ্র। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও-র ইকো ট্যুরিজম প্রকল্পের আওতায় দর্জিপাড়ায় ভিনদেশি টিউলিপ চাষ এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
পর্যটকদের আবাসন সুবিধার জন্য গড়ে উঠেছে ‘ইকো মহানন্দা কটেজ, গ্রিন টি ভ্যালি রিসোর্ট, মেঘালয় রিসোর্ট ও ‘মেঘকুঞ্জ’র মতো আধুনিক থাকার জায়গা। আর খাবারের স্বাদ দিতে প্রস্তুত রয়েছে ভোজনবাড়ী, জান্নাত ও শখের হাড়ি রেস্তোরাঁ ও বাংলা হোটেলের মতো ঘরোয়া হোটেলগুলো। পর্যটন মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করেন স্থানীয় ভ্যান ও অটোচালকরাও।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাশা
তেঁতুলিয়া ভ্রমণে আসা পর্যটকরা জানান, আতিথেয়তা ও প্রাকৃতিক শান্ত পরিবেশের জন্য এ অঞ্চলটি অনন্য। তবে পর্যটন সুবিধার জন্য এখানে আরও বড় আকারের বিনোদন কেন্দ্র বা থিম পার্ক তৈরির দাবি জানিয়েছেন তারা।
ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল মতিন জানান, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি। বিলবোর্ডের মাধ্যমে আমাদের কন্টাক্ট নম্বর সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে পুলিশ দ্রæত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তেঁতুলিয়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সম্পাদক রনি মিয়াজী বলেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে তেঁতুলিয়ায় এখন উৎসবের আমেজ। আমরা পর্যটকদের বিনোদনের জন্য স্থানীয় লোকজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনও করছি।
শরৎ আর হেমন্তের এই সন্ধিক্ষণে তেঁতুলিয়া এখন ডানা মেলা স্বপ্নের নাম। মেঘের পর্দা সরলেই যেখানে জেগে ওঠে প্রকৃতির পরম বিস্ময়’ কাঞ্চনজঙ্ঘা। আপনিও কি তৈরি সেই মায়াবী হাসি দেখার জন্য?

























