লালন স্মরণোৎসব ঘিরে মুখর ছেঁউড়িয়া, শেষ হয়েছে সব প্রস্তুতি

লালন স্মরণোৎসব ঘিরে মুখর ছেঁউড়িয়া, শেষ হয়েছে সব প্রস্তুতি

কুষ্টিয়া :
মরমি সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব। আগামীকাল ১৭ অক্টোবর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। উৎসবকে ঘিরে লালন আখড়াবাড়িতে শেষ হয়েছে মুহূর্তের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন লালনভক্ত, সাধু-ফকির ও বাউল অনুসারীরা। তাঁদের পদচারণায় উৎসব শুরুর আগেই মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি ও কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকা।

স্মরণোৎসব উপলক্ষে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। কালীগঙ্গা নদীর তীরের বিশাল মাঠে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ ও গ্রামীণ মেলার স্টল। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে তাঁদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে স্টল সাজিয়ে বসেছেন। পাশাপাশি মাজার প্রাঙ্গণ রঙিন আলোয় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে।

উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হতে এখনো বাকি থাকলেও আগে থেকেই লালনধামে আসতে শুরু করেছেন ভক্ত-অনুসারীরা। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাধু-গুরুরা শিষ্যদের মধ্যে চলবে ভাববিনিময়। অন্যদিকে ছোট ছোট দলে একতারা ও ঢোল বাজিয়ে লালনগীতি পরিবেশন করছেন বাউল শিল্পীরা। সব মিলিয়ে উৎসব শুরুর আগেই ছেঁউড়িয়ায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

লালনভক্ত মামুন সাধু বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস তাঁদের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও মানবতার মিলনমেলা। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। এবারও অনেকে আগেভাগে লালনধামে এসেছেন। উৎসব শুরুর আগেই এখানে সাধুসঙ্গ ও গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।

স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে লালন একাডেমি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনের এ উৎসব। প্রতিদিন আলোচনা সভা শেষে লালন মঞ্চে পরিবেশিত হবে লালনসংগীত। এতে অংশ নেবেন লালন একাডেমির শিল্পীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল শিল্পী ও লালনভক্তরা।

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, উৎসব ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। আয়োজন মাদকমুক্ত রাখতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদকসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

উল্লেখ্য, প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর, বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান ঘটে। সেই থেকে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে নানা আয়োজনে দিনটি স্মরণ করে আসছেন। লালনের গান, দর্শন ও মানবতার বাণীকে ধারণ করে প্রতিবছর এ আয়োজন পরিণত হয় বাউল-সাধু ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলায়।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
রাষ্ট্র ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে : ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস 

রাষ্ট্র ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে : ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস 

লালন স্মরণোৎসব ঘিরে মুখর ছেঁউড়িয়া, শেষ হয়েছে সব প্রস্তুতি

আপডেট সময় : ১১:৪৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কুষ্টিয়া :
মরমি সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব। আগামীকাল ১৭ অক্টোবর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। উৎসবকে ঘিরে লালন আখড়াবাড়িতে শেষ হয়েছে মুহূর্তের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন লালনভক্ত, সাধু-ফকির ও বাউল অনুসারীরা। তাঁদের পদচারণায় উৎসব শুরুর আগেই মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি ও কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকা।

স্মরণোৎসব উপলক্ষে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। কালীগঙ্গা নদীর তীরের বিশাল মাঠে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ ও গ্রামীণ মেলার স্টল। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে তাঁদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে স্টল সাজিয়ে বসেছেন। পাশাপাশি মাজার প্রাঙ্গণ রঙিন আলোয় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে।

উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হতে এখনো বাকি থাকলেও আগে থেকেই লালনধামে আসতে শুরু করেছেন ভক্ত-অনুসারীরা। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাধু-গুরুরা শিষ্যদের মধ্যে চলবে ভাববিনিময়। অন্যদিকে ছোট ছোট দলে একতারা ও ঢোল বাজিয়ে লালনগীতি পরিবেশন করছেন বাউল শিল্পীরা। সব মিলিয়ে উৎসব শুরুর আগেই ছেঁউড়িয়ায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

লালনভক্ত মামুন সাধু বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস তাঁদের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও মানবতার মিলনমেলা। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। এবারও অনেকে আগেভাগে লালনধামে এসেছেন। উৎসব শুরুর আগেই এখানে সাধুসঙ্গ ও গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।

স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে লালন একাডেমি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনের এ উৎসব। প্রতিদিন আলোচনা সভা শেষে লালন মঞ্চে পরিবেশিত হবে লালনসংগীত। এতে অংশ নেবেন লালন একাডেমির শিল্পীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল শিল্পী ও লালনভক্তরা।

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, উৎসব ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। আয়োজন মাদকমুক্ত রাখতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদকসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

উল্লেখ্য, প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর, বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান ঘটে। সেই থেকে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে নানা আয়োজনে দিনটি স্মরণ করে আসছেন। লালনের গান, দর্শন ও মানবতার বাণীকে ধারণ করে প্রতিবছর এ আয়োজন পরিণত হয় বাউল-সাধু ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলায়।