বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং কৃষি, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নসহ বিভিন্ন খাতে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কানাডার প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশ ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন গুরুত্ব পায়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্বারোপ
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশ কানাডার মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জনবহুল দেশ হিসেবে নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও দেশটিতেই নিহিত।
কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের গুরুত্বের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
জ্বালানি ও কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে বিবেচনার কথা জানানো হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা। নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং দক্ষ নার্স তৈরির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। এ খাতে বিদ্যমান কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় অংশীদারত্ব
কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা।
এ সময় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষক কার্ড কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের কাছে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণ করে কৃষি খাতে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
দারিদ্র্য বিমোচনে ফ্যামিলি কার্ডের সম্ভাবনা
সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা নয়; মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলারের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। কানাডার প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার দেওয়ার বিষয়ে তাঁর দেশের আগ্রহ রয়েছে। এ অর্থায়ন থেকে বাংলাদেশের উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের প্রশংসা
সাক্ষাতে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা ও ইতিবাচক মানসিকতার প্রশংসা করেন রণদীপ সরাই। তিনি জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুজন ব্যক্তি কানাডার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান দেশটির প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কানাডার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।



























