নিজস্ব প্রতিবেদক:
ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও দুর্নীতি মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নোটিশের মুখে পড়া বিতর্কিত সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল্লাহ আরেফ বাধ্যতামূলক অবসরে গিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি ডিআইজি পরিচয়ে অভিনব প্রতারণা, তদবির বাণিজ্য, ফ্ল্যাট দখল এবং মাদক ও মানবপাচারের সিন্ডিকেট পরিচালনার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি তাঁর এই অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন স্ত্রী ফারজানা আবেদীন।
দুদক ও অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট ও নৌ-পুলিশের সাবেক এসপি আব্দুল্লাহ আরেফের নিজ নামে ১ কোটি ২২ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৬ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানা আবেদীনের নামে ১ কোটি ৮১ লাখ ৮২ হাজার ২২১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। এই দম্পতির সম্পদের সঠিক হিসাব যাচাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬ (১) ধারা অনুযায়ী ইতোমধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করেছে দুদক। দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও অনুসন্ধানে আরও বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
র্যাংক ব্যাজ নিয়ে অভিনব প্রতারণা ও গুলশানে বিলাসবহুল জীবন:
চাকরিতে থাকাকালীন বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই সদস্য ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অতিরিক্ত ডিআইজির দৃশ্যমান পোশাকি ‘পিপস’ বা র্যাংক ব্যাজ পেলেও তাঁর পদোন্নতি হয়নি; তিনি বহাল ছিলেন এসপি পদেই। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র কর্মকর্তাদের দিয়ে সেই ব্যাজ পরানোর ছবি তুলে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। বর্তমানে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার পরও নিজের ফ্ল্যাটের নামফলকে ‘অবসরপ্রাপ্ত’ শব্দুলোপ করে নিজেকে ‘অতিরিক্ত ডিআইজি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেপরোয়া প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গুলশান-১ এর ২৪ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৩৮০০ স্কয়ার ফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি কাগজে-কলেমে স্ত্রী ফারজানা আবেদীনের নামে হলেও এর প্রকৃত মালিক আব্দুল্লাহ আরেফ নিজেই। ওই ভবনের ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে তিনি ভবনটির ম্যানেজার জাহিদুল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি মাসে ফ্ল্যাট মালিকদের সার্ভিস চার্জ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ছাদের মোবাইল টাওয়ারের ভাড়ার লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ভাগাভাগি করেন। জাহিদুল হোসেন তাঁর সমস্ত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান সহযোগী। এই চক্রের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না অন্য ফ্ল্যাট মালিকরা।
ফ্ল্যাট দখল ও সিলগালা কক্ষ ভাঙার পাঁয়তারা:
অভিযোগ রয়েছে, গুলশানের ওই ভবনে পলাতক এক সাবেক মন্ত্রীর ছেলের মালিকানাধীন ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ইতিমধ্যে দখল নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আরেফ। এছাড়া সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলায় আদালতের নির্দেশে সিলগালা করা একই ভবনের দ্বিতীয় তলার কালাম নামের আরেক ব্যক্তির ফ্ল্যাটটিও দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন তিনি। বাথরুমের পাইপ সংস্কারের মিথ্যা অজুহাতে গুলশান থানায় তালা ভাঙার আবেদন করে ভেতরে ঢোকার কৌশল নিয়েছেন এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।
ভবনটির পার্কিং ফ্লোরে একটি ল্যান্ড ক্রুজার, একটি প্রাডো, একটি বিএমডব্লিউ, একটি নোয়া, একটি প্রিমিও ও একটি হাইব্রিড কারসহ বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি রয়েছে, যেগুলোর মালিক আব্দুল্লাহ আরেফ ও তাঁর স্ত্রী। গুলশানের এই ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী তদবির বাণিজ্য চক্র।
চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা এবং জমি দখলের ইতিহাস:
এর আগে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে গরিব কৃষকদের জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়া, অর্থ আত্মসাৎ ও তথ্য পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানবপাচার ও মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী চর চামারদহ এলাকার আকছাইল মৌজায় কৃষকদের জমি জবরদখলের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন ভুক্তভোগীরা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কৃষকদের কৃষি জমি জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগে থানায় জিডি ও অভিযোগ দেওয়া হলেও সে সময় কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছিলেন অসহায় কৃষকরা।
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার পরও থামেনি এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বেপরোয়া দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রম। বর্তমানে তিনি গুলশান এলাকায় আত্মগোপনে থাকা সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের ফ্ল্যাট দখলের নতুন মিশনে নেমেছেন। দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে এই ভয়ংকর প্রতারক দম্পতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
বিজ্ঞাপন


























