সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের

সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত (Permanent Court of Arbitration—PCA) ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি কার্যকর রয়েছে বলে রায় দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।

নয়াদিল্লির দাবি, ভারতের সম্মতি ছাড়া গঠিত এই সালিশি আদালতের দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বা জলসম্পদ-সংক্রান্ত প্রকল্পের ওপর কোনো এখতিয়ার নেই।

সোমবার (৩১ আগস্ট) এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেগের সালিশি আদালতকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে অভিহিত করে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত এই সালিশি প্রক্রিয়া সিন্ধু পানি চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ভারত শুরু থেকেই এই আদালতের অস্তিত্ব ও এখতিয়ার স্বীকার করেনি এবং এর আগের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেনি।

ভারত আরও জানিয়েছে, আদালতের কোনো সিদ্ধান্তই দেশটির সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কিংবা চলমান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর প্রভাব ফেলবে না। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছিল, সেটিও বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

এর আগে সোমবার হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত জানায়, ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তি স্থগিত রাখার জন্য ভারতের কাছে বৈধ কোনো কারণ নেই বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।

আদালত আরও বলেছে, চুক্তির আওতায় পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়ন করবেন।

এ ছাড়া রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশ কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কী আছে সিন্ধু পানি চুক্তিতে?

বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় নদী রাভি, বিয়াস ও সুতলেজের পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারতের। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর পানির প্রধান অংশ পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত।

দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও কয়েক দশক ধরে চুক্তিটি কার্যকর ছিল। তবে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে চুক্তিটি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ভারত জানায়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত থাকবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে বইতে পারে না।’

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া

চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর ভারত সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, সিন্ধু পানি চুক্তির ওপর প্রায় ২৪ কোটি পাকিস্তানির জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। তিনি ভারতের সিদ্ধান্তকে বেআইনি দাবি করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এদিকে সিন্ধু নদের ওপর ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে তা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনির।

আদালতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ভারত জানিয়ে দিয়েছে, রায়টি দেশটির কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ফলে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ নতুন করে আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পানি-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া

জনপ্রিয়
তাহিরপুরে আমদানি কারক গ্ৰুপের নির্বাচন সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা খায়রুল বাশার

তাহিরপুরে আমদানি কারক গ্ৰুপের নির্বাচন সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা খায়রুল বাশার

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের

আপডেট সময় : ০৬:৩৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত (Permanent Court of Arbitration—PCA) ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি কার্যকর রয়েছে বলে রায় দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।

নয়াদিল্লির দাবি, ভারতের সম্মতি ছাড়া গঠিত এই সালিশি আদালতের দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বা জলসম্পদ-সংক্রান্ত প্রকল্পের ওপর কোনো এখতিয়ার নেই।

সোমবার (৩১ আগস্ট) এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেগের সালিশি আদালতকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে অভিহিত করে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত এই সালিশি প্রক্রিয়া সিন্ধু পানি চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ভারত শুরু থেকেই এই আদালতের অস্তিত্ব ও এখতিয়ার স্বীকার করেনি এবং এর আগের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেনি।

ভারত আরও জানিয়েছে, আদালতের কোনো সিদ্ধান্তই দেশটির সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কিংবা চলমান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর প্রভাব ফেলবে না। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছিল, সেটিও বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

এর আগে সোমবার হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত জানায়, ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তি স্থগিত রাখার জন্য ভারতের কাছে বৈধ কোনো কারণ নেই বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।

আদালত আরও বলেছে, চুক্তির আওতায় পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়ন করবেন।

এ ছাড়া রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশ কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কী আছে সিন্ধু পানি চুক্তিতে?

বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় নদী রাভি, বিয়াস ও সুতলেজের পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারতের। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর পানির প্রধান অংশ পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত।

দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও কয়েক দশক ধরে চুক্তিটি কার্যকর ছিল। তবে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে চুক্তিটি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ভারত জানায়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত থাকবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে বইতে পারে না।’

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া

চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর ভারত সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, সিন্ধু পানি চুক্তির ওপর প্রায় ২৪ কোটি পাকিস্তানির জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। তিনি ভারতের সিদ্ধান্তকে বেআইনি দাবি করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এদিকে সিন্ধু নদের ওপর ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে তা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনির।

আদালতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ভারত জানিয়ে দিয়েছে, রায়টি দেশটির কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ফলে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ নতুন করে আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পানি-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া