ভুল অস্ত্রোপচারের পর চার দফা অপারেশন! দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু বৃহস্পতিবার

ভুল অস্ত্রোপচারের পর চার দফা অপারেশন! দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু বৃহস্পতিবার

রাজন্য রুহানি, জামালপুর :

ভুল অপারেশনে জরায়ু-ডিম্বাশয় অপসারণ ও নাড়ি ছিদ্রের অভিযোগে জামালপুরের এম এ রশীদ হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে সরেজমিন তদন্ত শুরু করবে কমিটি। তদন্তে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বরকত ও জেনারেল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তাঁদের তত্ত্বাবধানে করা অস্ত্রোপচারে রোগীর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অংশ কেটে ফেলা এবং নাড়ি ছিদ্র হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন রোগী ও তাঁর স্বজনেরা।

অভিযুক্ত ওই দুই ডাক্তারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলামকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রাশেদা পারভীন, মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. দেলোয়ার হোসেন, চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. রোকসানা আক্তার এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জুনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিছুর রহমান।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে তদন্ত কার্যক্রম। সরেজমিনে হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র ও অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি তলপেটে ব্যথা নিয়ে এম. এ. রশীদ হাসপাতালে ভর্তি হন জামালপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার সাবেরী শারমিন। চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান যে, তাঁর ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ে সংক্রমণ রয়েছে এবং ডান ডিম্বাশয়ে রক্তভর্তি সিস্ট হয়েছে। পরে ২৯ জানুয়ারি ডা. সাবরিনা বরকত ও ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলা ও স্বজনদের অভিযোগে জানা যায়, অস্ত্রোপচারের আগে রোগী বা তাঁর স্বজনদের সম্মতি ছাড়াই জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। তবে সেগুলোর কিছু অংশ শরীরে রয়ে যায়। একই অস্ত্রোপচারের সময় পেটের তিন স্থানে নাড়ি ছিদ্র করার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের। এতে পরবর্তী সময়ে রোগীর শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা।

অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সেখানে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। স্বজনদের দাবি- পপুলার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আগের অস্ত্রোপচারে জটিলতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তৃতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখার পর ২০ জুন একই হাসপাতালে তাঁর চতুর্থবার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

রোগী ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের এম এ রশীদ হাসপাতালে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে চিকিৎসা করাতে তাঁদের মোট প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরে সাবেরী শারমিন অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি আমলে নিয়ে জেলা সিভিল সার্জনকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাবেরী শারমিন জানান- একটা ভুল অপারেশনে যে রোগীর কতটা ক্ষতি হতে পারে আমি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ডাক্তারদের অবহেলায় শুধু একটি জীবনই নয়, নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার পুরো পরিবার। ডাক্তারদের এই একটি ভুলের কারণে আমি সামাজিক, পারিবারিক, আর্থিক, মানসিক, শারিরীক- সবভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত। আমি আশা করি, তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ তদন্তে শ্বাশত সত্য উঠে আসবে এবং আমি আদালত হতে ন্যায়বিচার পাবো।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
তাড়াইলে বাড়ছে বায়ুদূষণ, ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু

তাড়াইলে বাড়ছে বায়ুদূষণ, ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু

ভুল অস্ত্রোপচারের পর চার দফা অপারেশন! দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু বৃহস্পতিবার

আপডেট সময় : ০২:১২:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

রাজন্য রুহানি, জামালপুর :

ভুল অপারেশনে জরায়ু-ডিম্বাশয় অপসারণ ও নাড়ি ছিদ্রের অভিযোগে জামালপুরের এম এ রশীদ হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে সরেজমিন তদন্ত শুরু করবে কমিটি। তদন্তে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বরকত ও জেনারেল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তাঁদের তত্ত্বাবধানে করা অস্ত্রোপচারে রোগীর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অংশ কেটে ফেলা এবং নাড়ি ছিদ্র হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন রোগী ও তাঁর স্বজনেরা।

অভিযুক্ত ওই দুই ডাক্তারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলামকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রাশেদা পারভীন, মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. দেলোয়ার হোসেন, চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. রোকসানা আক্তার এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জুনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিছুর রহমান।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে তদন্ত কার্যক্রম। সরেজমিনে হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র ও অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি তলপেটে ব্যথা নিয়ে এম. এ. রশীদ হাসপাতালে ভর্তি হন জামালপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার সাবেরী শারমিন। চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান যে, তাঁর ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ে সংক্রমণ রয়েছে এবং ডান ডিম্বাশয়ে রক্তভর্তি সিস্ট হয়েছে। পরে ২৯ জানুয়ারি ডা. সাবরিনা বরকত ও ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলা ও স্বজনদের অভিযোগে জানা যায়, অস্ত্রোপচারের আগে রোগী বা তাঁর স্বজনদের সম্মতি ছাড়াই জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। তবে সেগুলোর কিছু অংশ শরীরে রয়ে যায়। একই অস্ত্রোপচারের সময় পেটের তিন স্থানে নাড়ি ছিদ্র করার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের। এতে পরবর্তী সময়ে রোগীর শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা।

অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সেখানে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। স্বজনদের দাবি- পপুলার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আগের অস্ত্রোপচারে জটিলতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তৃতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখার পর ২০ জুন একই হাসপাতালে তাঁর চতুর্থবার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

রোগী ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের এম এ রশীদ হাসপাতালে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে চিকিৎসা করাতে তাঁদের মোট প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরে সাবেরী শারমিন অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি আমলে নিয়ে জেলা সিভিল সার্জনকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাবেরী শারমিন জানান- একটা ভুল অপারেশনে যে রোগীর কতটা ক্ষতি হতে পারে আমি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ডাক্তারদের অবহেলায় শুধু একটি জীবনই নয়, নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার পুরো পরিবার। ডাক্তারদের এই একটি ভুলের কারণে আমি সামাজিক, পারিবারিক, আর্থিক, মানসিক, শারিরীক- সবভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত। আমি আশা করি, তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ তদন্তে শ্বাশত সত্য উঠে আসবে এবং আমি আদালত হতে ন্যায়বিচার পাবো।