আনোয়ারুল ইসলাম রনি,রংপুর:
রংপুর নগরীতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীর হোসেন(৪৮) একসময় মানুষের কাছে সাহায্য নিয়ে চলতেন। পরে পত্রিকা বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। বর্তমানে পত্রিকা বিক্রি ছেড়ে পুরোপুরি যুক্ত হয়েছেন নগরীর যানজট নিরসনের কাজে। কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
জাহাঙ্গীর জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। বাবা নেই, আছেন শুধু মা। একসময় বিয়ে করলেও অভাবের সংসার ছেড়ে চলে গেছেন তাঁর স্ত্রী। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় একসময় মানুষের কাছে সাহায্য তুলে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।
একপর্যায়ে সাহায্য তোলা ছেড়ে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নেন জাহাঙ্গীর। শুরু করেন পত্রিকা বিক্রির কাজ। রংপুর প্রেসক্লাব মার্কেট থেকে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা সংগ্রহ করে নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, টাউন হল, ডিসির মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হেঁটে হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করতেন। এভাবে নগরীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন দেশ-বিদেশের খবর।
পত্রিকা বিক্রির সময় অনেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা ও পোশাক দেখে ভিক্ষুক মনে করে টাকা দিতে চাইতেন। তবে পত্রিকার মূল্য ছাড়া কারও কাছ থেকে অর্থ নিতেন না তিনি। বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিতেন সেই টাকা। পত্রিকা বিক্রি করেই নিজের জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতেন।
বর্তমানে জাহাঙ্গীর আর পত্রিকা বিক্রি করেন না। তিনি পুরোপুরি যুক্ত হয়েছেন রংপুর নগরীর যানজট নিরসনের কাজে। নগরীর সুপারমার্কেট, ব্যাংকের মোড়, সিটি বাজার, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও পায়রা চত্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করেন তিনি।
তবে এ কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক পান না জাহাঙ্গীর। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, এ পর্যন্ত কেউ তাঁকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন কি না এবং কীভাবে চলছে তাঁর সংসার। জবাবে তিনি জানান, ২০২১ সালে তৎকালীন রংপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) বিপ্লব কুমার সরকার তাঁকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে আর্থিক সহায়তা করেছিলেন। এরপর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাননি। বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করায় সংসার চালাতে তাঁকে কষ্ট করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য বলেন, “জাহাঙ্গীর প্রতিদিনই আমাদের কাজে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তাঁর জন্য কেউ কিছু করলে অবশ্যই ভালো হবে। তাঁর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলার সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “২০১০ থেকে ২০১২ সালের দিকে জাহাঙ্গীর মানুষের সাহায্য নিয়ে চলতেন। একদিন প্রেসক্লাবের সামনে আমার কাছে সাহায্য চাইলে আমি তাঁকে সরাসরি অর্থ না দিয়ে দৈনিক প্রথম আলো, ইত্তেফাক, যুগের আলো ও রংপুর চিত্রসহ বিভিন্ন পত্রিকার প্রায় ২০০ কপি কিনে দিই। তাঁকে বলেছিলাম, পত্রিকাগুলোই হবে তোমার পুঁজি, আর সাহায্য চাইতে হবে না। আমি চেষ্টা করেছিলাম তাঁকে স্বাবলম্বী করে তুলতে।”
তিনি আরও বলেন, “জাহাঙ্গীর দায়িত্বশীল ও আন্তরিক একজন মানুষ। আমার মনে হয়, ব্যবসায়ীদের সংগঠন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন তাঁর জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। আমি তাঁর সুস্থ ও শান্তিময় জীবন কামনা করছি।”
একসময় মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া জাহাঙ্গীর পরবর্তী সময়ে নিজের পরিশ্রমে পত্রিকা বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বিনা পারিশ্রমিকে রংপুর নগরীর যানজট নিরসনে সহযোগিতা করছেন। তাঁর এই জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি উঠে এসেছে স্থায়ী জীবিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, ব্যবসায়ী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে জাহাঙ্গীরের জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।





















