লামায় নদী-ঝিরির ভাঙনে বিলীনের পথে শত বছরের পুরোনো শ্মশান

লামায় নদী-ঝিরির ভাঙনে বিলীনের পথে শত বছরের পুরোনো শ্মশান

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান)

বান্দরবানের লামা পৌর শহরের হাসপাতালপাড়া এলাকায় শত বছরের পুরোনো একমাত্র শ্মশানটি এখন বিলীনের পথে। একদিকে মাতামুহুরী নদী, অন্যদিকে পাহাড়ি নুনার ঝিরির ভাঙনে দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে শ্মশানটির পরিসর। নানা সমস্যায় জর্জরিত পৌর এলাকার প্রায় ৬০০ পরিবারের শেষকৃত্যের একমাত্র নির্ভরযোগ্য স্থানটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

ভাঙন রোধে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, শ্মশান সংস্কার, লাইটিং ব্যবস্থা, বাউন্ডারি ওয়াল ও লাশঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পৌর প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে মাতামুহুরী নদীর পাড় ও নুনার ঝিরির শেষ প্রান্তে প্রায় ৪০ শতক জায়গার ওপর লামা কেন্দ্রীয় শ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পৌরসভা এলাকায় আর কোনো শ্মশান না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মৃতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার একমাত্র স্থান হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নুনার ঝিরি ও মাতামুহুরী নদীর পানির স্রোতে শ্মশানটির পাড়ে ভাঙন দেখা দেয়। পানি কমে গেলেও ভাঙন অব্যাহত থাকে। এতে শ্মশানের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বারবার বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিরি ও নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্মশান এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। দাহ ও সমাধিস্থলের অনেক জায়গায় পানি উঠে যায়। শ্মশানের স্থাপনাতেও পানি ঢুকে পড়ে। ভাঙনে ইতোমধ্যে শত শত সমাধিস্থল বিলীন হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

শ্মশানটি দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বর্তমানে মৃতদেহ দাহের জন্যও নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যাপ্ত লাইটিং ব্যবস্থা না থাকায় রাতে দাহকার্য সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাউন্ডারি ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা না থাকায় রাতে শ্মশানটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

লামা কেন্দ্রীয় শ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি অলক কান্তি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক বাসু কর্মকার বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এলাকার প্রবীণদের কাছে শুনে আসছি, প্রায় ১০০ বছর আগে এই শ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবছরই এটি ভাঙছে। ভাঙতে ভাঙতে ৪০ শতক জায়গার মধ্যে এখন আনুমানিক ১৫ শতক জায়গা অবশিষ্ট আছে।”

বিজ্ঞাপন

তারা বলেন, “আগামী বর্ষার আগে শ্মশানের উত্তর ও পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ ফুট রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি নির্মাণ করা না হলে আগামী বর্ষায় অবশিষ্ট অংশও বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

শ্মশান পরিচালনা কমিটির নেতারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া এবং বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় শ্মশানটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রাতে লাইটিং ব্যবস্থা না থাকায় কেউ মারা গেলে দাহকার্য সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শ্মশানের নিরাপত্তায় বাউন্ডারি ওয়াল, ভাঙন রোধে রিটেইনিং ওয়াল, পর্যাপ্ত লাইটিং এবং একটি লাশঘর নির্মাণের দাবি জানান তারা।

লামা বাজারের ছোট নুনারবিল পাড়ার বাসিন্দা খগেশ প্রতি চন্দ্র খোকন বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শ্মশানের সঙ্গে। এখানে আমাদের ধর্মীয় রীতি মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। এখন সেটিই হারানোর পথে।”

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দ্রুত শ্মশান রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

প্রবীণ সনাতন ধর্মাবলম্বী অমর কান্তি চৌধুরী বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শুধু শ্মশানই নয়, আশপাশের বসতবাড়িও হুমকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে শত বছরের পুরোনো শ্মশানটি রক্ষা পায় এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “লামা কেন্দ্রীয় শ্মশান ঝিরিতে বিলীনের বিষয়ে কেউ আমাকে জানায়নি। তবে পৌর প্রকৌশলীর মাধ্যমে বিষয়টি বিস্তারিত জেনে শ্মশানের ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ট্যাগ
জনপ্রিয়
শ্রীমঙ্গলে ২৯ পিস ইয়াবাসহ এক নারী গ্রেপ্তার 

শ্রীমঙ্গলে ২৯ পিস ইয়াবাসহ এক নারী গ্রেপ্তার 

লামায় নদী-ঝিরির ভাঙনে বিলীনের পথে শত বছরের পুরোনো শ্মশান

আপডেট সময় : ০১:১০:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান)

বান্দরবানের লামা পৌর শহরের হাসপাতালপাড়া এলাকায় শত বছরের পুরোনো একমাত্র শ্মশানটি এখন বিলীনের পথে। একদিকে মাতামুহুরী নদী, অন্যদিকে পাহাড়ি নুনার ঝিরির ভাঙনে দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে শ্মশানটির পরিসর। নানা সমস্যায় জর্জরিত পৌর এলাকার প্রায় ৬০০ পরিবারের শেষকৃত্যের একমাত্র নির্ভরযোগ্য স্থানটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

ভাঙন রোধে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, শ্মশান সংস্কার, লাইটিং ব্যবস্থা, বাউন্ডারি ওয়াল ও লাশঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পৌর প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে মাতামুহুরী নদীর পাড় ও নুনার ঝিরির শেষ প্রান্তে প্রায় ৪০ শতক জায়গার ওপর লামা কেন্দ্রীয় শ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পৌরসভা এলাকায় আর কোনো শ্মশান না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মৃতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার একমাত্র স্থান হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নুনার ঝিরি ও মাতামুহুরী নদীর পানির স্রোতে শ্মশানটির পাড়ে ভাঙন দেখা দেয়। পানি কমে গেলেও ভাঙন অব্যাহত থাকে। এতে শ্মশানের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বারবার বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিরি ও নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্মশান এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। দাহ ও সমাধিস্থলের অনেক জায়গায় পানি উঠে যায়। শ্মশানের স্থাপনাতেও পানি ঢুকে পড়ে। ভাঙনে ইতোমধ্যে শত শত সমাধিস্থল বিলীন হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

শ্মশানটি দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বর্তমানে মৃতদেহ দাহের জন্যও নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যাপ্ত লাইটিং ব্যবস্থা না থাকায় রাতে দাহকার্য সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাউন্ডারি ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা না থাকায় রাতে শ্মশানটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

লামা কেন্দ্রীয় শ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি অলক কান্তি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক বাসু কর্মকার বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এলাকার প্রবীণদের কাছে শুনে আসছি, প্রায় ১০০ বছর আগে এই শ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবছরই এটি ভাঙছে। ভাঙতে ভাঙতে ৪০ শতক জায়গার মধ্যে এখন আনুমানিক ১৫ শতক জায়গা অবশিষ্ট আছে।”

বিজ্ঞাপন

তারা বলেন, “আগামী বর্ষার আগে শ্মশানের উত্তর ও পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ ফুট রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি নির্মাণ করা না হলে আগামী বর্ষায় অবশিষ্ট অংশও বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

শ্মশান পরিচালনা কমিটির নেতারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া এবং বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় শ্মশানটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রাতে লাইটিং ব্যবস্থা না থাকায় কেউ মারা গেলে দাহকার্য সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শ্মশানের নিরাপত্তায় বাউন্ডারি ওয়াল, ভাঙন রোধে রিটেইনিং ওয়াল, পর্যাপ্ত লাইটিং এবং একটি লাশঘর নির্মাণের দাবি জানান তারা।

লামা বাজারের ছোট নুনারবিল পাড়ার বাসিন্দা খগেশ প্রতি চন্দ্র খোকন বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শ্মশানের সঙ্গে। এখানে আমাদের ধর্মীয় রীতি মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। এখন সেটিই হারানোর পথে।”

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দ্রুত শ্মশান রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

প্রবীণ সনাতন ধর্মাবলম্বী অমর কান্তি চৌধুরী বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শুধু শ্মশানই নয়, আশপাশের বসতবাড়িও হুমকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে শত বছরের পুরোনো শ্মশানটি রক্ষা পায় এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “লামা কেন্দ্রীয় শ্মশান ঝিরিতে বিলীনের বিষয়ে কেউ আমাকে জানায়নি। তবে পৌর প্রকৌশলীর মাধ্যমে বিষয়টি বিস্তারিত জেনে শ্মশানের ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”