সরকার শাহাদাত হোসেন
গাইবান্ধা—সম্ভাবনায় ভরা একটি জেলা। কৃষি, নদী, রেল ও সড়ক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকা সত্ত্বেও আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—উন্নয়নের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গাইবান্ধাকে একটি আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী জেলা হিসেবে গড়ে তোলা।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি হচ্ছে পলাশবাড়ী থেকে গাইবান্ধা হয়ে বালাসী ঘাট পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করা। জেলার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার পলাশবাড়ী থেকে গাইবান্ধা শহরের দূরত্ব প্রায় ২১ কিলোমিটার। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তঃজেলা যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সড়কটির গুরুত্ব অনেক।
কিন্তু সড়কের সক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের চাপ বাড়ায় বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ। তাই দীর্ঘদিন ধরে পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা-বালাসী সড়ককে পর্যায়ক্রমে চার লেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
রেলগেটেই আটকে যায় শহর
গাইবান্ধা শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর রেলগেট। জেলার ভেতর দিয়ে রেল যোগাযোগ চালু থাকায় প্রতিদিন একাধিক ট্রেন চলাচল করে। ট্রেন আসার সময় রেলগেট বন্ধ হয়ে গেলে দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
অনেক সময় রেলগেট থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হয়ে পুরাতন জেলখানা পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়ে। রিকশা, অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একটি ট্রেন পার হওয়ার জন্য আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় আটকে থাকার ঘটনাও স্থানীয়দের কাছে নতুন নয়।
দিনে একাধিকবার এভাবে রেলগেট বন্ধ হওয়ায় শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই নয়, চালক ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সমাধানে প্রয়োজন ফ্লাইওভার ও বাইপাস
শহরের যানজট নিরসনে দীর্ঘদিনের দাবি—গাইবান্ধা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিং এলাকায় একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা। একই সঙ্গে শহরের যানবাহনের চাপ কমাতে খানকাহ শরীফ হয়ে কাউয়া চত্বর দিয়ে ভিভিটি কোম্পানি পর্যন্ত একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবিও রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বাইপাসটি বাস্তবায়িত হলে দূরপাল্লার ও শহরের ভেতর দিয়ে চলাচলের প্রয়োজন নেই এমন যানবাহনগুলো বিকল্প পথে চলাচল করতে পারবে। এতে শহরের মূল সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং যানজটও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
দারিয়াপুর ব্রিজেও নিত্য যানজট
গাইবান্ধা জেলা কারাগার এলাকা থেকে দারিয়াপুর পর্যন্ত সড়কেও প্রতিদিন যানবাহনের চাপ দেখা যায়। বিশেষ করে দারিয়াপুর ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক সরু হওয়ায় বিভিন্ন সময় যানজট সৃষ্টি হয়। ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক প্রশস্ত করা হলে এই এলাকার যান চলাচল আরও স্বাভাবিক হতে পারে।
এদিকে হরিপুর সেতু চালু হওয়ার পর কুড়িগ্রাম ও চিলমারীসহ আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ফলে গাইবান্ধার ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলও বেড়েছে। এতে একদিকে জেলার যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বালাসী-বাহাদুরাবাদে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি
উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য বালাসী ঘাট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের।
এই ধরনের বৃহৎ যোগাযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চল ও রাজধানীর মধ্যে পণ্য পরিবহন আরও সহজ হতে পারে। বিশেষ করে গাইবান্ধার কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার উৎপাদিত ধান, সবজি, রবিশস্যসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।
উচ্চশিক্ষায় গাইবান্ধার দীর্ঘ অপেক্ষা
শুধু যোগাযোগ নয়, উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাতেও গাইবান্ধাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে। জেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি বহুদিনের।
গাইবান্ধা মূলত কৃষিনির্ভর জেলা। এখানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষকের প্রশিক্ষণ এবং নতুন জাত ও উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়বে।
পাশাপাশি গাইবান্ধায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিও দীর্ঘদিনের। জেলার মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং গাইবান্ধাকে একটি শিক্ষা-কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে দাবি রয়েছে।
উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলতে পারে সমন্বিত পরিকল্পনা
গাইবান্ধার মানুষের প্রত্যাশা শুধু একটি সড়ক বা একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়; তারা চান সমন্বিত উন্নয়ন। পলাশবাড়ী-বালাসী ফোর লেন সড়ক, শহরে ফ্লাইওভার, বাইপাস সড়ক, দারিয়াপুর ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক প্রশস্তকরণ, বালাসী-বাহাদুরাবাদে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ—এসব দাবির বাস্তবায়ন জেলার যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
গাইবান্ধার কৃষক দ্রুত তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে চান, শিক্ষার্থী চান নিজের জেলাতেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ, রোগী চান উন্নত চিকিৎসা, আর ব্যবসায়ী চান দ্রুত ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ।
তাই গাইবান্ধাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা একটাই—উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।
গাইবান্ধার সম্ভাবনা অনেক; এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো বড় ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা।



















