১৯ বছর ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী স্বামী। নিজের সম্বল বলতে শুধু বসতভিটা। মাঠে নেই আবাদি জমি। সংসারের কাজের পাশাপাশি ইচ্ছা ছিল কিছু করার, আবার দীর্ঘ বছর পর বিদেশ থেকে এসে স্বামী কি করবেন, সেই পরিকল্পনা থেকে আনকমন কিছু চাষাবাদ করার লক্ষ্যে লিজ নেওয়া জমিতে শুরু করেন মাল্টা চাষ। আর তাতেই বাজিমাত, পেয়েছেন ঈর্ষানীয় সাফল্য। মাল্টা চাষ তাকে এনে দিয়েছেন সফল নারী উদোক্তার পরিচিতি।
বলছি, পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের হোগলবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ শারমিন খাতুনের কথা। যিনি উপজেলাব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন মাল্টা ভাবি হিসেবে। তার উৎপাদিত মাল্টা স্থানীয় বাজারে সমানভাবে টেক্কা দিচ্ছে আমদানি করা বিদেশি মালটার সাথে।
সাইজ,স্বাদ ও মানেও কমতি নেই বিদেশি মাল্টার চেয়ে। শারমিন খাতুনের বাগানের মাল্টা সবুজ বর্ণের হওয়ায় বাজারে দামের প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পরলেও উদ্যোমে ভাটা পরেনি তার। বানিজ্যিক সফলতা পেতে নতুনভাবে অস্ট্রেলিয়া হলুদবর্ণের মাল্টা চাষ সম্পসারণ করেছেন আরও ১ বিঘা জমিতে।
সফল এই নারী উদ্যোগতার মাল্টা চাষের সফলতা এখন মানুষের মুখে মুখে। নতুন কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে বিশেষ করে নারীদের কাছে এখন অনুকরণীয় নাম শারমিন খাতুন।
শারমিন খাতুন হোগলবাড়িয়া গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আব্দুল খালেকের স্ত্রী। তিনি ২০০৭ মাল থেকে প্রবাসী। তাদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে এবছর এসএসসি পাশ করেছে। মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে।
শুরুর গল্পটা ২০২০ সালের দিকে। করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে তরুণরা যখন কৃষিকে আঁকড়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় স্বপ্ন বুনছে, তখন অন্যদের মতো নারী উদ্যোক্তা শারমিন খাতুনও কৃষিতে আত্মনিবেশ করেন। অন্যদের মতো সহজ পথে না হেঁটে কৃষিতে তিনি গ্রহণ করেন নতুন চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, অন্য ব্যবসায় লোকসানের আশঙ্কা আছে। আর গতানুগতিক ব্যবসার চেয়ে নতুন কিছু আনকমন জিনিস চাষাবাদকে আমার কাছে গুরুত্ব মনে হয়েছে, যাতে বাজারে ভাল দাম পাওয়া যায়। সেই চিন্তা থেকে পাল্টা চাষের পরিকল্পনা করা। আর একটা বিষয় হলো আমার স্বামী বিদেশে থাকেন। তিনি যাতে দেশে এসে ভাল কিছু করতে পারেন, কোনো সমস্যায় পড়তে না হয় সেই চিন্তা থেকেও মাল্টা চাষে আগ্রহ হয়।
আলাপকালে জানান, এরপর পাঁচ বছর মেয়াদে লিজ নেওয়া ২ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন ভিয়েতনামী ও বারি-১ জাতের মাল্টার বাগান। ২০২৩ সালে প্রথম ফলন আসা শুরু হয়। প্রথম বছর গাছের যত্ন ও ধরে রাখার কারণে খুব একটা বিক্রি করতে পারিনি। তবে ২০২৫ সাল থেকে ভরপুর ফলন আসছে।
জমির লিজ বাবদ খরচ ও পরিচর্যা খরচ মিটিয়ে ২০২৪-২৫ সালে লাভ করেন ২ লক্ষাধিক টাকা। এ বছরও ফলের ভারে নুয়ে পরেছে গাছ। থোকায় থোকায় ঝুলছে মাল্টা। গাছের মাল্টার হাসিতে হাসির ঝিলিক এখন শারমিন খাতুনের মুখেও। এবছর দুই বিঘা জমির মাল্টার বাগান থেকে ৪ লাখ টাকার আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এ নারী উদ্যোক্তা।
গ্রামের শেষ মাথায় রেললাইনের ধারে প্রত্যন্ত গ্রামের যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়েও শারমিন খাতুনের ফলানো মাল্টা দেখতে মানুষ ভিড় করছেন দলে দলে। কেউ জানছেন চাষ পদ্ধতি, কেউ শুনছেন লাভের হিসাব। মাল্টা চাষের সফলতা শারমিন খাতুনকে যেমন উপজেলাব্যাপী মাল্টা ভাবি হিসেবে পরিচিত করছে, তেমনি তিনি হয়ে উঠেছেন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয়।
শারমিন খাতুন বলেন, শুরুর দিকে মাল্টার বাগান করা নিয়ে আশপাশের অনেকেই কটাক্ষ করলেও তিনি থেমে যাননি । বরং স্বপ্ন ছিল সফল হওয়ার। সফল হয়েছেনও তিনি। যে জমিতে মাল্টার বাগান করছি সেখানে উচ্চ মূল্যের ফসল চাষ করা সম্ভব ছিল না। প্রচলিত চাষাবাদ করে এ জমি থেকে লাভ করা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। অথচ সেখানে মাল্টার বাগান করে হাসছেন তিনি।
তিনি জানান, মাল্টা চাষে সফল হওয়ায় আরো এক বিঘা জমিতে নতুনভাবে বাগান করেছেন। তার মতে তার বাগানের মাল্টা সবুজবর্ণের কারণে কিছুটা দাম কম পান। সেজন্য বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলুদ জাতের নতুন মাল্টার বাগান করেছেন তিনি। এ কারণে এখন এলাকার সবাই আমাকে মাল্টা ভাবি বলে ডাকে।
কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, শারমিন খাতুন মাল্টার বাগান করেছেন জানতে পেরেই আমি নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ রাখি।
মাল্টার চাষ অন্যান ফসলের চেয়ে ব্যাতিক্রম হওয়ায় পরামর্শ প্রদান ও তার জন্য উপজেলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি।
সমতলে মাল্টা চাষ ও কমলা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে জানিয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাঈদ জানান, চাটমোহর উপজেলায় বেশ কেয়েকটি মাল্টার বাগান গড়ে উঠলেও শারমিন খাতুন যে সফলতা পেয়েছেন তা অনন্য। মুলতঃ ভিয়েতনামী জাতের মাল্টা সারা বছরেই ফলন দেওয়ার কারণে লাভ বেশি হয়। রস ও মিষ্টতাও অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ বলেন, শারমিন খাতুনের মতো উদ্যোগী কৃষকদের কৃষি অফিস বিশেষ যত্ন করে থাকে। আমরা তাকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষন দিয়েছি। ফল মেলায় শারমিন খাতুনের মাল্টা প্রদর্শন করার পর অনেক কৃষক তার সফলতায় মাল্টা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আশা করা যায়। উপজেলায় দিন দিন মালটা চাষ সম্পসারিত হবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চাটমোহর উপজেলায় ১৫ বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাল্টা চাষে সফলতা পেয়েছেন ২৩ থেকে ২৪ জন কৃষক।