সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
“হামাতো বালুর গর্তোত পড়ি গেছি বাহে”—তিস্তা-ধরলার পাড়ের মানুষের মুখে এখন এমন আর্তনাদই শোনা যাচ্ছে। একসময় যে নদী ছিল জীবিকা, কৃষি ও বসতির অবলম্বন, সেই নদীর বুকেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক গভীর গর্ত। কোথাও ড্রেজারের পাইপ, কোথাও শ্যালো মেশিন, আবার কোথাও নদীতীর ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা বালু। দিনের পাশাপাশি রাতেও চলছে বালু উত্তোলনের অভিযোগ। এতে বদলে যাচ্ছে নদীর তলদেশ ও প্রবাহের স্বাভাবিক চরিত্র। বাড়ছে নদীভাঙন, ঝুঁকিতে পড়ছে কৃষিজমি, বসতভিটা ও মানুষের নিরাপত্তা।
লালমনিহাট জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও ধলাই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও তীর থেকে মাত্র ২০–৩০ মিটার দূরে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলায় বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুুনীল কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, নদীতীর থেকে ৪০০–৫০০ মিটার দূরে বালু উত্তোলন করলে ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে তীরের খুব কাছ থেকে বালু তোলা হলে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এও এমন স্থান থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ভাঙন, ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ফসলি জমি বা প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কালীগঞ্জের মহিষখোচা এলাকার বাসিন্দা তপু সিংহ (৩৬) বলেন, “আগে নদীর এক পাশে ভাঙলে অন্য পাশে চর জাগত। এখন চারপাশ থেকে বালু তোলায় নদীর ভাঙনের কোনো দিশা নেই। রাতে শান্তিতে ঘুমাতেও পারি না।”
পাটগ্রামের ধলাই নদীর পাড়ের কৃষক নাসিমুল করিম (৫৫) বলেন, “নদীঘেঁষা দুই বিঘা ভুট্টা ও ধানের জমি বালু তোলার গর্তে ধসে গেছে। জমি হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।”
চলতি বছরের মে মাসে লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুরে তিস্তার গভীর গর্তে ডুবে দুই ভাই সিফাউল করিম সিফাত ও সোহায়েব করিম স্বচ্ছের মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনে সেখানে প্রায় ১৫–১৬ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছিল।
নদী গবেষক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বালু ও পলি অপসারণে নদীর স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। নদীর তলদেশ, পানির প্রবাহ এবং পলি জমার হার বিশ্লেষণ না করে শুধু ইজারা বা রাজস্বের হিসাবের ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের সঙ্গে ভূমিক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির সম্পর্ক উঠে এসেছে। সোমেশ্বরী নদীতে ২০২০–২৩ সালের গবেষণায় ৩১ হেক্টর ভূমিক্ষয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে নদীভেদে প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাটগ্রামের মাশানটারীতে একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুনে কালীগঞ্জের ভোটমারীতে ব্যাপকভাবে ড্রেজার ও পাইপ জব্দ করে পাইপ ধ্বংস করা হয়।
জেলা প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অনুমোদনহীন স্থান থেকে বালু উত্তোলন আইনসিদ্ধ নয়। অবৈধ উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে ড্রেজার জব্দ, জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা ব্যারাজ থেকে চণ্ডীমারী পর্যন্ত বাম তীরে ৯ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ধরলার বিভিন্ন অংশেও তীর সংরক্ষণ ও নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তিস্তা পাহাড়ি ও পলিবাহী নদী হওয়ায় বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহ, পলি জমার হার ও তীরের স্থিতিশীলতা বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা প্রতিবছর বাথিমেট্রিক সার্ভে, সেডিমেন্ট বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট/GPS নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন। স্থানীয় হিসাবে, তিস্তায় সহনীয় ৫–৭ লাখ ঘনমিটারের বিপরীতে বছরে ২০–২৫ লাখ ঘনমিটার পর্যন্ত বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এর সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক যাচাই নেই।




















