বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন স্কেলে প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হবে। দীর্ঘ ১২ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল চালু হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৯তম বৈঠকে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে সন্ধ্যায় তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি।
তিনি জানান, জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬’ও অনুমোদন করা হয়েছে। এটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন এবং এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গঠিত সচিব কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনার পর নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নতুন পে স্কেলের মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। পরবর্তী বছরের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ এবং পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এরপর ওই অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সুপারিশ করা হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে ন্যায্যতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় এটি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর বিকল্প হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
- মাসিক ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ।
- ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ।
- ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ।
- ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের বাড়বে ৬০ শতাংশ।
- ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়বে ৫৫ শতাংশ।
চালু হচ্ছে প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
নতুন বেতন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালু করা হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেলেও নতুন বেতন স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
উপকৃত হবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারের মতে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মউদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর করতে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এতে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে।


























