সুন্দর ও স্বচ্ছল জীবনের আশায় প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমান। তাঁদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গেলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেকে গন্তব্য দেশে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়েন।
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং গৃহবন্দি করে রাখার মতো অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কেউ কেউ দেশে ফেরেন মরদেহ হয়ে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবে পাঁচ বছরে গড়ে বছরে ৮২টির বেশি মরদেহ ফিরেছে।
বিদেশে যাওয়া বাড়লেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নারী শ্রমিকের অভিবাসন কয়েক বছর ধরে ওঠানামা করলেও চলতি বছরে তা কিছুটা বেড়েছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে যান। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ৫ হাজার ২১৪ জন বা প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বিদেশফেরত অনেক নারী শ্রমিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বেতন না পাওয়া এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করছেন।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর গবেষণায় দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের কর্মপরিবেশের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন। ৯৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং ৯৭ শতাংশ সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। এছাড়া ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।
সংসদে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি
সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন।
নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান তিনি।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশে থাকা কর্মীরাও এই নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো সহযোগিতা করে।
নতুন শ্রমবাজারেও যাচ্ছেন নারীরা
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও জর্দানের পাশাপাশি জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীরা যাচ্ছেন। তবে নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা এখনো মূলত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
প্রশিক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনেক নারী বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন ও কর্মপরিবেশ পান না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনিরের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের ভাষা, কাজের দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাঁদের গৃহকর্মের বাইরে নার্সিং ও পরিচর্যার মতো কাজেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নারী শ্রমিকদের বিদেশে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে যাওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তা যাচাই, লিখিত চুক্তি, দূতাবাসের কার্যকর সহায়তা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।























