ইসলামে আড়ালে অন্যের ক্ষতি করার পরিণতি কী? কোরআন-হাদিসের আলোকে জানুন

আড়ালে অন্যের ক্ষতি করা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

আড়ালে অন্যের ক্ষতি করা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষ সামনে থাকুক বা না থাকুক—তার সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

মানুষের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায় তখনই, যখন যার সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে তিনি সামনে থাকেন না। সামনাসামনি ভালো ব্যবহার করা সহজ হলেও, অনুপস্থিতিতেও তার সম্মান, অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।

ইসলাম হিংসা, অপবাদ, ষড়যন্ত্র, প্রতিশোধ কিংবা গোপনে অন্যের ক্ষতি করার সব ধরনের আচরণ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাকেও সদকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত থাকাও সদকা

হজরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ যদি সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তবে অন্তত অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুক। এটিও তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ)

অর্থাৎ, শুধু ভালো কাজ করাই নয়, অন্যের ক্ষতি না করাও ইসলামের দৃষ্টিতে একটি নেক আমল।

সামনে একরকম, আড়ালে আরেকরকম আচরণ

ইসলাম দ্বিমুখী আচরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হবে সেই ব্যক্তি, যে এক দলের সামনে এক রূপে এবং অন্য দলের সামনে অন্য রূপে উপস্থিত হয়। (সহিহ বুখারি: ৬০৫৮, সহিহ মুসলিম: ২৫২৬)

এ ধরনের আচরণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভেদ সৃষ্টি করে।

হিংসা থেকেই জন্ম নেয় অন্যের ক্ষতির প্রবণতা

অন্যের সাফল্য, সম্মান বা ভালো অবস্থান দেখে হিংসা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, প্রতারণা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং গোপনে একে অপরের ক্ষতি করার চেষ্টা করো না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা।

ক্ষতির উদ্দেশ্যে গোপন ষড়যন্ত্র নিন্দনীয়

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, গোপন পরামর্শ যদি মুমিনদের কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা শয়তানের প্ররোচনায় পরিচালিত কাজ। (সুরা মুজাদালা: আয়াত ১০)

তবে কল্যাণ, ন্যায় বা প্রয়োজনীয় বিষয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শ বা আলোচনা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

ক্ষতির জবাবে ক্ষতিও নয়

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—অন্যের ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধ হিসেবে ক্ষতি করাও বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতি করা যাবে না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)

এই শিক্ষা মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সব ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

মানুষের হক নষ্ট করলে আখেরাতে জবাবদিহি

রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘নিঃস্ব ব্যক্তি’ সম্পর্কে বলেছেন, এমন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন অনেক ইবাদতের সওয়াব নিয়ে আসবে। কিন্তু মানুষের ওপর জুলুম, অপমান, সম্পদ আত্মসাৎ বা অন্যায়ের কারণে তার নেক আমল ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

এ কারণে ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায় করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃত মুমিনের পরিচয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি: ১০)

আরেক হাদিসে এসেছে, প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যাকে মানুষ তাদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপদ মনে করে। (সুনানে তিরমিজি: ২৬২৭)

অর্থাৎ একজন মুমিনের কথা ও কাজে অন্যের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ থাকা উচিত নয়।

ভুল হয়ে গেলে করণীয়

রাগ, হিংসা বা আবেগের বশে কারও ক্ষতি করে ফেললে শুধু অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। আল্লাহর কাছে তাওবা করার পাশাপাশি যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়াও ইসলামের শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন করে, তা জানেন।” (সুরা গাফির: ১৯)

তাই মানুষ সামনে থাকুক বা না থাকুক, তার সম্মান, অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। মানুষের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠাই ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সত্যিকারের মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জনপ্রিয়
মাদক থেকে যুব সমাজকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেইঃ শাহাদাত হোসেন সেলিম এমপি 

মাদক থেকে যুব সমাজকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেইঃ শাহাদাত হোসেন সেলিম এমপি 

ইসলামে আড়ালে অন্যের ক্ষতি করার পরিণতি কী? কোরআন-হাদিসের আলোকে জানুন

আড়ালে অন্যের ক্ষতি করা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

আপডেট সময় : ০৮:১৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানুষের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায় তখনই, যখন যার সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে তিনি সামনে থাকেন না। সামনাসামনি ভালো ব্যবহার করা সহজ হলেও, অনুপস্থিতিতেও তার সম্মান, অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।

ইসলাম হিংসা, অপবাদ, ষড়যন্ত্র, প্রতিশোধ কিংবা গোপনে অন্যের ক্ষতি করার সব ধরনের আচরণ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাকেও সদকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত থাকাও সদকা

হজরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ যদি সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তবে অন্তত অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুক। এটিও তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ)

অর্থাৎ, শুধু ভালো কাজ করাই নয়, অন্যের ক্ষতি না করাও ইসলামের দৃষ্টিতে একটি নেক আমল।

সামনে একরকম, আড়ালে আরেকরকম আচরণ

ইসলাম দ্বিমুখী আচরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হবে সেই ব্যক্তি, যে এক দলের সামনে এক রূপে এবং অন্য দলের সামনে অন্য রূপে উপস্থিত হয়। (সহিহ বুখারি: ৬০৫৮, সহিহ মুসলিম: ২৫২৬)

এ ধরনের আচরণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভেদ সৃষ্টি করে।

হিংসা থেকেই জন্ম নেয় অন্যের ক্ষতির প্রবণতা

অন্যের সাফল্য, সম্মান বা ভালো অবস্থান দেখে হিংসা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, প্রতারণা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং গোপনে একে অপরের ক্ষতি করার চেষ্টা করো না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা।

ক্ষতির উদ্দেশ্যে গোপন ষড়যন্ত্র নিন্দনীয়

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, গোপন পরামর্শ যদি মুমিনদের কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা শয়তানের প্ররোচনায় পরিচালিত কাজ। (সুরা মুজাদালা: আয়াত ১০)

তবে কল্যাণ, ন্যায় বা প্রয়োজনীয় বিষয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শ বা আলোচনা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

ক্ষতির জবাবে ক্ষতিও নয়

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—অন্যের ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধ হিসেবে ক্ষতি করাও বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতি করা যাবে না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)

এই শিক্ষা মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সব ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

মানুষের হক নষ্ট করলে আখেরাতে জবাবদিহি

রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘নিঃস্ব ব্যক্তি’ সম্পর্কে বলেছেন, এমন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন অনেক ইবাদতের সওয়াব নিয়ে আসবে। কিন্তু মানুষের ওপর জুলুম, অপমান, সম্পদ আত্মসাৎ বা অন্যায়ের কারণে তার নেক আমল ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

এ কারণে ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায় করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃত মুমিনের পরিচয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি: ১০)

আরেক হাদিসে এসেছে, প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যাকে মানুষ তাদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপদ মনে করে। (সুনানে তিরমিজি: ২৬২৭)

অর্থাৎ একজন মুমিনের কথা ও কাজে অন্যের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ থাকা উচিত নয়।

ভুল হয়ে গেলে করণীয়

রাগ, হিংসা বা আবেগের বশে কারও ক্ষতি করে ফেললে শুধু অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। আল্লাহর কাছে তাওবা করার পাশাপাশি যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়াও ইসলামের শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন করে, তা জানেন।” (সুরা গাফির: ১৯)

তাই মানুষ সামনে থাকুক বা না থাকুক, তার সম্মান, অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। মানুষের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠাই ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সত্যিকারের মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।