শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল পেরিয়ে এবার ধানের মাঠে শিক্ষার নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে দিনাজপুরের আমাদের পাঠশালা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। বইয়ের পাতায় কৃষি ও ধান চাষের পাঠ পড়ার পাশাপাশি তারা সরাসরি মাঠে গিয়ে দেখেছে ধানের বিভিন্ন জাত, চাষপদ্ধতি, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক ধান উৎপাদনের নানা কৌশল। এতে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল ও আগ্রহ।
সম্প্রতি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সহায়তায় দিনাজপুর সদরের কাউগাঁ-হুগলীপাড়া কৃষি প্রযুক্তি গ্রাম পরিদর্শন করে। ব্যতিক্রমী এ শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি গ্রামের রাইস গার্ডেনে তিন মৌসুমে চাষযোগ্য বিভিন্ন জাতের ধানের প্রদর্শনী প্লট ঘুরে দেখে। একই সঙ্গে ব্রির আঞ্চলিক কার্যালয়ে বিভিন্ন জাতের ধান ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হয় তারা।
বইয়ের পাঠ থেকে ধানের মাঠে:
শিক্ষার্থীদের কাছে ধান চাষ এতদিন মূলত ছিল পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায়। ধানের বীজ থেকে চারা, জমি প্রস্তুত, রোপণ, পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ধান কাটার বিষয়গুলো তারা বইয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া বাস্তবে কেমন, কোন মৌসুমে কোন জাতের ধান ভালো হয় কিংবা জাতভেদে ধানের গাছের পার্থক্য কী—এসব বিষয়ে সরাসরি জানার সুযোগ তাদের অনেকেরই হয়নি।
প্রযুক্তি গ্রামে গিয়ে সেই ধারণারই পরিবর্তন ঘটে। ধানের মাঠে দাঁড়িয়ে তারা একসঙ্গে বিভিন্ন জাতের ধান দেখার সুযোগ পায়। রাইস গার্ডেনে পাশাপাশি থাকা বিভিন্ন প্রদর্শনী প্লট ঘুরে তারা ধানের গাছ, শিষ, গাছের আকৃতি ও জাতভেদে পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করে। ফলে কৃষি বিষয়ে বইয়ে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞান তাদের কাছে বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়।
বিশেষ করে এক মাঠে ৫৪ জাতের ধান দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো জানতে পারে, ধানের জাতের বৈচিত্র্য কতটা বিস্তৃত এবং অঞ্চল ও মৌসুমভেদে কৃষকেরা কীভাবে উপযোগী জাত নির্বাচন করেন।

তিন মৌসুমের ধান একই জায়গায়:
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১৫টি প্রযুক্তি গ্রাম রয়েছে। দিনাজপুর সদরের কাউগাঁ-হুগলীপাড়া প্রযুক্তি গ্রাম এর অন্যতম। এসব প্রযুক্তি গ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের আধুনিক ধান চাষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি ও ফলাফল কৃষকের মাঠে প্রদর্শনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া।
কাউগাঁ-হুগলীপাড়া প্রযুক্তি গ্রামের রাইস গার্ডেনে তিন মৌসুমের বিভিন্ন জাতের ধান প্রদর্শন করা হয়। একই স্থানে বিভিন্ন জাতের ধান দেখতে পাওয়ায় কৃষক, শিক্ষার্থী ও আগ্রহী দর্শনার্থীরা জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য তুলনা করার সুযোগ পান।
কৃষকেরা এসব প্রদর্শনী দেখে নিজেদের জমির মাটি, পরিবেশ, পানি ও মৌসুমের উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন করতে পারেন। পাশাপাশি আধুনিক চাষপদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করেন।


ব্রির আঞ্চলিক কার্যালয়েও শিক্ষার্থীদের পাঠ:
প্রযুক্তি গ্রামে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয় পরিদর্শন করে। সেখানে তারা বিভিন্ন জাতের ধান এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র সম্পর্কে পরিচিত হয়। ধান গবেষণা, জাত উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়।
পরে ব্রি দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসানের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা কাউগাঁ-হুগলীপাড়া প্রযুক্তি গ্রামে যায়। সেখানে মাঠ পর্যায়ে ধানের বিভিন্ন প্রদর্শনী প্লট ঘুরে দেখার পাশাপাশি ধান চাষের নানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা নেয়।
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ছিল—কোন ধান কোন মৌসুমে ভালো হয়, কোন জাতের ফলন বেশি, কোন জাত সুগন্ধি, কোন ধানের চাষে সময় কম লাগে, কৃষক কীভাবে জাত নির্বাচন করেন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ধানের উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়। সংশ্লিষ্টরা তাদের এসব প্রশ্নের উত্তর দেন।
‘এক মাঠে ৫৪ জাতের ধান দেখে বিস্মিত’:
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান আহনাফ বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই ভাত খাই। তবে ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল না। আমাদের শিক্ষকদের ধন্যবাদ, তাঁরা আমাদের এ সুযোগ করে দিয়েছেন। ধানের যে এত জাত আছে, সেটিও আমরা জানতাম না। দিনাজপুরে এত সুগন্ধি জাতের ধান আবাদ হয়, এটাও জানতাম না। এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।’
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিশা ফাইরুজ বলেন, ‘এক মাঠে ৫৪ জাতের ধান দেখে আমি বিস্মিত। আগে ধানখেত দেখেছি, কিন্তু এভাবে কখনো দেখিনি। দিনাজপুরে এত জাতের ধান আবাদ হয়—এটা জানতাম না। দিনাজপুরের সন্তান হিসেবে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে।’
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, মাঠে এসে কৃষির বাস্তব চিত্র দেখার কারণে ধান চাষের বিষয়গুলো তাদের কাছে অনেক বেশি সহজ ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। শুধু বইয়ে পড়ে যে বিষয়গুলো মনে রাখা কঠিন, বাস্তবে দেখে সেগুলো সহজেই বোঝা গেছে।
শিক্ষার্থীদের আগ্রহে খুশি ব্রির কর্মকর্তা:
ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, দিনাজপুরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, ‘এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক ধান চাষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় ঘটছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা এসে এসব প্রদর্শনী পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘আজ পাঠশালা স্কুলের শিক্ষার্থীরা এসেছে। তাদের আগ্রহ দেখে আমি আপ্লুত হয়েছি। ভবিষ্যতে তারাই দেশকে নেতৃত্ব দেবে। কৃষি সম্পর্কে এখন থেকেই তাদের বাস্তব ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তি গ্রাম পরিদর্শনের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাদের অনেক কাজে দেবে।’
শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার নতুন ভাবনা:
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবন ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই চিন্তা থেকেই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিয়ে গিয়ে কৃষি ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিনিয়র শিক্ষক নাজমুল হাসান জয় ও সাহানাজ পারভীন সানুর নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা এ শিক্ষা সফরে অংশ নেয়। শিক্ষকদের মতে, কৃষিনির্ভর দেশের শিক্ষার্থীরা যদি ছোটবেলা থেকেই কৃষির বাস্তবতা, কৃষকের শ্রম এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করে, তাহলে ভবিষ্যতে কৃষিকে ঘিরে নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে কৃষি শুধু ঐতিহ্যগত চাষাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উন্নত জাত, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, সঠিক সময়ে বীজ নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং পানি ব্যবস্থাপনার মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়গুলো কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে নতুন প্রজন্মকে কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া সময়ের দাবি।
কৃষির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সেতুবন্ধন:
দিনাজপুর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক গভীর। কিন্তু শহর ও আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থী কৃষির বাস্তব উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় কাউগাঁ-হুগলীপাড়া প্রযুক্তি গ্রামের মতো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কৃষির একটি নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। ধানের মাঠে গিয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু ধান দেখেনি; তারা দেখেছে একটি প্রধান খাদ্যশস্য কীভাবে উৎপাদিত হয়, কৃষি গবেষণা কীভাবে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হয় এবং প্রযুক্তি কীভাবে কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের এই মাঠভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম তাই নিছক একটি শিক্ষা সফর নয়; বরং বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি কার্যকর উদ্যোগ। ধানের শিষ থেকে কৃষি প্রযুক্তি—সবকিছু সরাসরি দেখে যে অভিজ্ঞতা তারা অর্জন করেছে, তা ভবিষ্যতে কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের চিন্তাভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
আর এভাবেই শ্রেণিকক্ষের পাঠ যখন ধানের মাঠে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন শিক্ষা হয়ে ওঠে আরও জীবন্ত, আনন্দময় ও দীর্ঘস্থায়ী।





















