নীলফামারী মহিলা কলেজে ৩ হাজার ছাত্রী, ইংরেজির শিক্ষক মাত্র একজন

একজন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে চলছে তিন হাজারের বেশি ছাত্রীর পাঠদান

একজন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে চলছে তিন হাজারের বেশি ছাত্রীর পাঠদান

নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজে । ছবি নিজস্ব

একরামুল হক লাবু, নীলফামারী থেকে: 

নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজে তিন হাজারের বেশি ছাত্রীর পাঠদান চলছে তীব্র শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। একইভাবে গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। ফলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপরও বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ।

নীলফামারী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কলেজ সূত্রে জানা যায়, নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে ১৯৭২ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে শিক্ষাক্ষেত্রে এর অবদান ও সুনামের কারণে ১৯৮৪ সালে এটি সরকারি করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জেলার নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে কলেজটি।

বর্তমানে কলেজটিতে এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ এবং বিএ/বিএসএসসহ স্নাতক ও ছয়টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু রয়েছে। এসব বিভাগ ও কোর্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।

কলেজের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি বিষয়ে পদ অনুযায়ী চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র একজন সহযোগী অধ্যাপক তহমিন আরা আলম। গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে দুজন করে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। অন্যান্য কয়েকটি বিষয়েও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংকট রয়েছে।

এ ছাড়া অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাজিয়া আফরিন (৩৪তম বিসিএস) ২০২২ সাল থেকে কলেজে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ইংরেজি বিভাগের একমাত্র শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক তহমিন আরা আলম বলেন, একাদশ, দ্বাদশ, বিএ ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের ছাত্রীদের ইংরেজি ক্লাস নিতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘একজনের পক্ষে এতগুলো ক্লাস পরিচালনা করা খুবই কষ্টকর। শিক্ষার মান উন্নয়নে দ্রুত কলেজটিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে দেখা দিয়েছে জমির সংকটও। প্রতিষ্ঠার সময় সীমিত জায়গা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় কলেজের জমির পরিমাণ বাড়েনি।

বিজ্ঞাপন

কলেজের শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক আবু জাফর মোহাম্মদ মুহসিনুল করিম বলেন, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বহির্ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুশীলন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে স্বল্প পরিসরের মাঠে কোনো রকমে হ্যান্ডবল অনুশীলন করানো সম্ভব হলেও অন্যান্য খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কলেজের পাশের জমিটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে খেলাধুলার মাঠের সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাসও আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে কলেজের ভবন সংকটের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। নীলফামারী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হাজেরুল ইসলাম জানান, কলেজের আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই ভবনটিতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ করা হবে।

নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ফিরোজুল ইসলাম বলেন, কলেজটিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংকট রয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। পাশাপাশি গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও কোনো শিক্ষক নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের চাহিদা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, নতুন আধুনিক ভবনের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল বোর্ড ও মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানে আগ্রহ আরও বাড়বে।

কলেজের ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে অধ্যক্ষ বলেন, পাশের জমিটি কলেজের জন্য বরাদ্দ করা গেলে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, খেলাধুলার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবার সহযোগিতায় নারী শিক্ষাবান্ধব এই প্রতিষ্ঠানকে একটি আলোকিত ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জনপ্রিয়
ইবি জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার উদ্যোগে আলিম উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

ইবি জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার উদ্যোগে আলিম উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

নীলফামারী মহিলা কলেজে ৩ হাজার ছাত্রী, ইংরেজির শিক্ষক মাত্র একজন

একজন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে চলছে তিন হাজারের বেশি ছাত্রীর পাঠদান

আপডেট সময় : ১১:১৫:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একরামুল হক লাবু, নীলফামারী থেকে: 

নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজে তিন হাজারের বেশি ছাত্রীর পাঠদান চলছে তীব্র শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। একইভাবে গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। ফলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপরও বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ।

নীলফামারী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কলেজ সূত্রে জানা যায়, নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে ১৯৭২ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে শিক্ষাক্ষেত্রে এর অবদান ও সুনামের কারণে ১৯৮৪ সালে এটি সরকারি করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জেলার নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে কলেজটি।

বর্তমানে কলেজটিতে এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ এবং বিএ/বিএসএসসহ স্নাতক ও ছয়টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু রয়েছে। এসব বিভাগ ও কোর্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।

কলেজের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি বিষয়ে পদ অনুযায়ী চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র একজন সহযোগী অধ্যাপক তহমিন আরা আলম। গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে দুজন করে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। অন্যান্য কয়েকটি বিষয়েও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংকট রয়েছে।

এ ছাড়া অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাজিয়া আফরিন (৩৪তম বিসিএস) ২০২২ সাল থেকে কলেজে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ইংরেজি বিভাগের একমাত্র শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক তহমিন আরা আলম বলেন, একাদশ, দ্বাদশ, বিএ ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের ছাত্রীদের ইংরেজি ক্লাস নিতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘একজনের পক্ষে এতগুলো ক্লাস পরিচালনা করা খুবই কষ্টকর। শিক্ষার মান উন্নয়নে দ্রুত কলেজটিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে দেখা দিয়েছে জমির সংকটও। প্রতিষ্ঠার সময় সীমিত জায়গা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় কলেজের জমির পরিমাণ বাড়েনি।

বিজ্ঞাপন

কলেজের শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক আবু জাফর মোহাম্মদ মুহসিনুল করিম বলেন, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বহির্ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুশীলন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে স্বল্প পরিসরের মাঠে কোনো রকমে হ্যান্ডবল অনুশীলন করানো সম্ভব হলেও অন্যান্য খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কলেজের পাশের জমিটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে খেলাধুলার মাঠের সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাসও আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে কলেজের ভবন সংকটের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। নীলফামারী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হাজেরুল ইসলাম জানান, কলেজের আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই ভবনটিতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ করা হবে।

নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ফিরোজুল ইসলাম বলেন, কলেজটিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংকট রয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। পাশাপাশি গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও কোনো শিক্ষক নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের চাহিদা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, নতুন আধুনিক ভবনের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল বোর্ড ও মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানে আগ্রহ আরও বাড়বে।

কলেজের ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে অধ্যক্ষ বলেন, পাশের জমিটি কলেজের জন্য বরাদ্দ করা গেলে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, খেলাধুলার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবার সহযোগিতায় নারী শিক্ষাবান্ধব এই প্রতিষ্ঠানকে একটি আলোকিত ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।