অফিসের ব্যস্ততায় বেশ কিছুদিন ধরেই দম ফেলার ফুরসত নেই। এরই মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে আমার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে একের পর এক ফোন আসছিল বন্ধু, স্বজন, পরিজনদের কাছ থেকে। সবার কথার বিষয় একটাই বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ইউনিটের নির্বাচন।
পরিচিত অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানলাম, নির্বাচন বেশ জমে উঠেছে। অনেকের আবদার নির্বাচনের দিন যেন অবশ্যই উপস্থিত থাকি। কারণ, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু পুরোনো বাল্যবন্ধু, আত্মীয়-স্বজনও ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় আসবেন। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে তাদের সঙ্গে দেখা হবে, আড্ডা হবে। এমন অনেকের সঙ্গেই হয়তো ঈদ কিংবা কোনো উৎসব ছাড়া সচরাচর দেখা হওয়ার সুযোগ হয় না।
শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্খিত দিন এলো। গতকাল ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ইউনিটের কার্যকরী কমিটি ২০২৬-২৮ মেয়াদের নির্বাচন। আর আজ ৬ সেপ্টেম্বর রোববার ভোরে প্রকাশ হলো পূর্ণাঙ্গ ফলাফল। মজার ব্যাপার হলো, গতকাল নির্বাচন উপভোগ করে যখন ফলাফল প্রকাশিত হচ্ছে, তখন আমি আবার ঢাকায় ফিরে এসেছি।
তবে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সফরটা আমার মনে জমিয়ে দিয়েছে বেশ কিছু সুখস্মৃতি।
ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় পৌঁছানোর পর থেকেই একে একে দেখা হয়েছে অসংখ্য স্বজন, বাল্যবন্ধু ও পরিচিতজনের সঙ্গে। ভোটকেন্দ্র ব্রাহ্মণবাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা পেয়েছি বহু শ্রদ্ধেয় গুণীজন ও অগ্রজ ব্যক্তির। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে বেশ তৃপ্তি পেয়েছি। মনে হয়েছে, সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য আমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই চেনা, প্রিয় ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায়।
রেড ক্রিসেন্ট নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নারী-পুরুষ, প্রবীণ-তরুণ সবাই ভোট দিতে এসেছেন। এতদিন পর একটি নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে আনন্দের।

আমার কাছে এই নির্বাচন শুধু একটি সংগঠনের কার্যকরী কমিটি নির্বাচনের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল মানুষের গণতান্ত্রিক চর্চা ও অংশগ্রহণেরও একটি সুন্দর উদাহরণ। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আজীবন ও বার্ষিক সদস্যদের অধীর আগ্রহে ভোট প্রদান যেন সেই বার্তাই দিয়েছে—গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা এখনো প্রবল।
সুদীর্ঘ বছর পর গণতান্ত্রিক পদযাত্রায় একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর নির্বাচনী আমেজ তৈরির নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এমপি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসকের পদযাত্রা, সেই সঙ্গে সকল দল ও মতের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন যেন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। ভিন্ন মত ও পথের মানুষ একই কাতারে দাঁড়িয়ে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতার মাঝে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া স্কুল মার্কেটের রামুদার চায়ের দোকানে বসেছিল বন্ধুদের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথায় কথায় কত কথা! ফিরে এসেছে শৈশবের কত স্মৃতি, পুরোনো দিনের কত গল্প। হাসি-আনন্দ আর স্মৃতিচারণে কখন যে সময় কেটে গেল, টেরই পাইনি।
একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় আমার এই স্বল্প সময়ের ফেরা হয়ে থাকল অনেকটা শৈশবে ফিরে যাওয়ার মতো। দেখা হলো প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে, হলো পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আর সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম অসংখ্য সুখস্মৃতি। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিটের কার্যকরী কমিটির নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে মো. আসাদুজ্জামান শাহীন এবং সেক্রেটারি পদে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন সাইদ হাসান সানি, আশিকুল ইসলাম সুমন, রুমেল উদ্দিন আহমেদ, তানভীর রুবেল ও মহিবুল ইসলাম ডিকন। রেড ক্রিসেন্ট ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ইউনিটের নবনির্বাচিত কার্যকরী কমিটির প্রতি রইল আন্তরিক শুভকামনা। আশা করি, নতুন নেতৃত্ব মানবতার সেবায় আরও গতিশীল ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।




















