সরকার শাহাদত হোসেন
একসময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাটির চাকায় ঘুরত জীবিকার চাকা। কাদামাটির ঘ্রাণে মুখর থাকত কুমারপাড়া। কারও হাতে তৈরি হতো হাঁড়ি-পাতিল, কারও হাতে কলসি, সানকি, গরুর খাবারের চাড়ি, আবার কারও নিপুণ কারুকাজে ফুটে উঠত মাটির পুতুল ও খেলনা। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল এসব মাটির পণ্যের ব্যবহার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও মেলামাইনের আগ্রাসনে সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলাতেই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে।
একসময় যে শিল্প ছিল পাল বা কুমার সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান জীবিকা, সেই শিল্পের সঙ্গে এখন যেন জড়িয়ে আছে টিকে থাকার লড়াই। ক্রেতার অভাব, মাটিসহ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি কাঠের বাড়তি দাম এবং পর্যাপ্ত পুঁজির সংকটে অনেক কারিগর বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে মাটির চাকা, কোথাও আবার নিভে গেছে মাটির পাত্র পোড়ানোর চুলা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় একসময় মৃৎশিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। বিশেষ করে পলাশবাড়ীর হরিনাথপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পালপাড়ায় ছিল মৃৎশিল্পীদের কর্মচাঞ্চল্য। বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলসি ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরির ধুম পড়ে যেত। এখন সেই কর্মব্যস্ততা অনেকটাই অতীত।
সাদুল্লাপুর উপজেলার মৃৎশিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত কারিগর অধোর চন্দ্র বলেন, “একসময় সাদুল্লাপুরসহ গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় মৃৎশিল্পের অনেক কদর ছিল। মানুষ দৈনন্দিন কাজে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাটনা, কুয়ার পাট, গরুর খাবারের চাড়ি ও কলসি ব্যবহার করতেন। নালি গুড় ও দানা গুড় সংরক্ষণের জন্যও মাটির কলসির ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তখন আমাদের তৈরি জিনিসপত্রের ভালো চাহিদা ছিল। এখন প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যে বাজার ছেয়ে গেছে। মাটির জিনিসের ক্রেতা কমে যাওয়ায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
পলাশবাড়ী উপজেলার পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী কণিকা রানী পাল বলেন, “মা-বাবার কাছ থেকে শেখা এই কাজ করে ২৬ বছর পার করেছি। আগে পুকুর বা খেতের মাটি বিনা মূল্যে পাওয়া যেত, এখন টাকা দিয়ে কিনতে হয়। তার ওপর খড়ি-কাঠের দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় মাটির জিনিসের দাম পাওয়া যায় না। প্লাস্টিক ও মেলামাইনের কারণে মানুষ এখন মাটির হাঁড়ি কিনতে চান না। পেটের দায়ে অনেকে রিকশা চালানো কিংবা দিনমজুরের কাজ করছেন। সরকারি সহযোগিতা না পেলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় থাকবে না।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “ছোটবেলায় দেখেছি, ফেরিওয়ালারা মাথায় করে গ্রামে গ্রামে মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও খেলনা বিক্রি করতেন। এখন গ্রামের হাটবাজারেও এসব জিনিস খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়লেও পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে মৃৎশিল্প আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্পকে বাঁচাতে আধুনিক বিপণনব্যবস্থা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা জরুরি।”
গাইবান্ধা বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) সহকারী মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল ফেরদৌস বলেন, “মৃৎশিল্প আমাদের আদি লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শৌখিন ও নকশাদার পণ্য তৈরিতে কারিগরদের অভ্যস্ত করতে কাজ করা হচ্ছে। মৃৎশিল্পীদের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগররা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ নিলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পণ্য বাজারজাতকরণে বিসিকের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শুধু প্রশিক্ষণ বা আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বল্প সুদে ঋণ, সহজলভ্য কাঁচামাল, জ্বালানিতে সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি, নকশার উন্নয়ন এবং দেশজুড়ে বাজার তৈরির উদ্যোগ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতাও জরুরি।
একসময় যে মাটির কলসিতে সংরক্ষিত থাকত নালি গুড় ও দানা গুড়, যে হাঁড়িতে রান্না হতো গ্রামের মানুষের প্রিয় খাবার, সেই মাটির পণ্য আজ বাজার হারিয়ে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে গাইবান্ধার কুমারদের হাতের নিপুণ শিল্প হয়তো একদিন শুধু স্মৃতির পাতায় কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। হারিয়ে যাবে মাটির সঙ্গে মানুষের হাজার বছরের নিবিড় সম্পর্কের এক অনন্য ঐতিহ্য।





















