সাহারুল হক সাচ্চু . উল্লাপাড়া ( সিরাজগঞ্জ ):
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় একটি হিজল গাছ সবার কাছে বিশ্বাসের হয়ে আছে। মনের আশা পূরণে গাছটির
কাছে মানত করা হয়। গাছটির গোড়ায় ছোড়া হয় মাটির ঢিল। নানা রং এর টুকরো কাপড় ডালপালায় বেধে দেওয়া
হয়। নানা আশায় মাছ ডালে ঝুলানো হয়। মঙ্গলের প্রতিক বিবেচনা আর বিশ্বাস এসব নাকি করা হয়।
উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের চান্ডালগাতী সড়কের পাশে খোলা জায়গায় হিজল গাছটি ডালপালা মেলে আছে। প্রায় পচিশ ফুট উচু গাছটির গোড়া বেশ মোটাসোটা। গোড়ায় বড় ছোটো কয়েকটি ঢোড় আছে।
প্রতিদিন শুকনো মৌসুমের আট থেকে নয় মাস গাছটির সামনের গজাইল সড়ক পথে নানা বয়সের নানা পেশার
বহুজন চলাচল করেন। উপজেলার গজাইল, মহেশপুর, চয়ড়া, ভায়ড়া, দিঘলগ্রাম, বিনায়েকপুর, আলিগ্রাম, রাহুলিয়া ও আশপাশের আরো অনেক গ্রামের লোকজন চান্ডালগাতীর হিজল গাছটি চোখের দেখায় চেনেন এবং গাছটি ঘিরে মানত করা,ঢিল ছোড়ার সব কিছুই জানেন। এলাকার প্রবীন ব্যক্তিদের কথায় তারা সেই ছোটবেলা থেকেই আজকের অবস্থায় গাছটিকে দেখে আসছেন। তাদের বাপ-দাদারা( পূর্ব পুরুষেরা) নাকি এভাবেই দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।
চান্ডালগাতী গ্রামের প্রায় ছিয়াত্তর বছর বয়সি মো. শাহাদত হোসেন, দীঘলগ্রামের প্রায় পয়ষট্রি
বছর বয়সি ব্যবসায়ি মো. নজরুল ইসলাম, গজাইলের প্রায় বাষট্টি বছর বয়সি অটো চালক ওসমান গণি বলেন
সড়ক পথের ধারের হিজল গাছটি এখনকার এমন অবস্থা ছোটকাল থেকেই দেখে আসছেন। এরা বলেন বিভিন্ন এলাক থেকে একাকি কিংবা দলবেধে এসে মনের আশা পূরণে গাছটির গোড়ায় মাটির ঢিল ছোড়েন। কেউ ব্যবসায়
মালামাল নিয়ে বেচতে যাওয়াকালে মাটির ঢিল ছোড়েন ও গাছ ছুয়ে যান। প্রায় আটচল্লিশ বছর বয়সি গৃহবধু
মোছা.সাজেদা খাতুন বলেন গাছটির তার শ্বশুর পরিবারের জায়গায়। তিনি বিয়ের পর স্বামী বাড়ী এসে গাছটি
যেমন দেখেছেন এখন দেখতে ঠিক তেমনি বলে জানান। তিনি দিনে একবার হলেও গাছতল এসে ঘুরে দেখে যান।
চান্ডালগাতী গ্রামের জামাই মো. খোদা বক্ম বলেন বর্ষাকালের পর মাঠে ফসলের আবাদে মাস দুয়েক এখানে থেকে
গাছটি নিয়ে অনেকেরই বিশ্বাস, ভক্তির অনেক কিছুই দেখে আসছেন। একজন গ্রাম্য দোকানি বাই সাইকেলে
চালিয়ে গয়হাট্রা যাওয়াকালে গাছের কাছে নেমে সেখান থেকে একটি মাটির দলা নিয়ে গাছটির গোড়ায়
ছোড়েন। তিনি বলেন ছোটবেলা থেকেই তিনি চান্ডালগাতী সড়ক পথে গাছটির সামনে দিয়ে যাওয়া আসাকালে
মাটির ঢিল ছোড়েন। নিজ ব্যবসায় উন্নতি আর নিজের মঙ্গল কামনায় নিজ বিশ্বাস থেকে মাটির ঢিল ছোড়েন।
মো. সোহরাব আলী বলেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন গাছতলায় এসে নানা কিছু মানত করেন।
বিভিন্ন এলাকার নানা বয়সি নানা পেশার লোকজন এখানে এসে তাদের মনের আশা পূরণে গাছতলায় দাড়িয়ে নানা
ধরনের মানত করে থাকে। এরা সাথে আনা নানা ধরনের খাবার গাছটির গোড়ায় রেখে যান। এদের কেউ কেউ নানা রং এর টুকরো কাপড় গাছের ডালে বেধে দেন। আবার কেউ কেউ জীবিত মাছ দড়িতে বেধে ডালে ঝুলিয়ে দেন। আবার এলাকার জেলেরা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে গাছটির ডালে এক-দুটি মাছ ঝুলিয়ে রেখে যান। সরেজমিনে পুরো গাছ জুড়ে নানা রং এর টুকরো কাপড় ও মাছ ( বেশিরভাগ মাছ শুকিয়ে শুটকি হয়ে গেছে) ঝুলানো দেখা গেছে। এলাকার লোকজনের কাছ থেকে আরো জানা গেছে অনেকেই নিজ ব্যবসা বাণিজ্যে বেরিয়ে সড়ক পথে চলতে গাছটি ছুয়ে যান। এছাড়া পায়ে হেটে চলার পথে অমঙ্গল যেন না হয় এমনটি ভেবে কয়েক সেকেন্ড দাড়িয়ে আবার হেটে চলেন। এদের কেউ কেউ আকারে ছোটো হলেও গাছটির গোড়ায় মাটির ঢিল ছোড়েন। প্রতাপ থেকে গয়হাট্রা যাওয়াকালে অটোভ্যান থেকে নেমে বাসেত মিয়া সড়কের পাশের জমি থেকে মাটির ঢিল তুলে গাছটিতে ছোড়েন ও ছুয়ে দেন।
তিনি এটি কুসংস্কার জেনেও নিজ মনের বিশ্বাসে যাওয়া – আসার পথে গাছটিতে একটি হলেও ঢিল ছোড়েন ও
ছুয়ে দেন। আরেকজন আশরাফুল ইসলাম বলেন তিনি চলার পথে নিজের অমঙ্গল হতে পারে ভেবে ঢিল ছোড়েন। কোনো কিছু মানত কোনো দিন করেন নি। এলাকায় ঘুরে গাছটি ঘিরে মনের আশা পূরণে মানত করা কারো মনের আশা পূরণ হয়েছে কিনা তা জানতে কাউকে পাওয়া যায়নি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সারোয়ার হোসেন বলেন
বিষয়টি পুরোপুরি কুসংস্কার।
উল্লাপাড়া কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মো. আবু তালেব মোল্লা বলেন কোনো অবস্থাতেই গাছটিকে ঘিরে মানত করা
যাবে না। গাছের ডালপালায় কাপড় বাধা , মাছ ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এসব কাজ কোনো অবস্থায় ভালো নয়। যে
কাজ ভালো নয় সে কাজ করা যাবে না।
উল্লাপাড়া উপজেলা বন কর্মকর্তা দেওয়ান শহিদুজ্জামান বলেন আগের দিনে বেশিরভাগ মানুষ কুসংস্কারে বিশ্বাস
করতো। এখনো অনেকেই করেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে বলা চলে। এখনো অনেকেই নানা কুসংস্কার
বিশ্বাসী হয়ে গাছ গাছালীর কাছে মনের আশা পূরণে মানত করে থাকেন। তবে তিনি বিশ্বাস করেন এক সময়
এসব কুসংস্কার আর থাকবে না। এমনিতেই সব বন্ধ হয়ে যাবে। সবাইকে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।




















