আলি হায়দার, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সকাল ১১টা। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচরের ধানখেতে হঠাৎ নামল একটি হেলিকপ্টার। আকাশ থেকে হেলিকপ্টার নামতে দেখে মুহূর্তেই ধানখেতের চারপাশে জড়ো হন শত শত মানুষ। হেলিকপ্টারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ফুলের মালায় সজ্জিত এক তরুণ। তিনি ওই গ্রামেরই সন্তান, পোল্যান্ডপ্রবাসী মো. নাঈম ভূঁইয়া (২৪)।
মায়ের স্বপ্ন, পরিবারের আনন্দ এবং নিজের একটি শখ পূরণ করতেই ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন নাঈম। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচরের ফর্দানিয়া বাড়ির পাশে ধানখেতে হেলিকপ্টারটি অবতরণ করে।
নাঈম ভূঁইয়া পশ্চিম জগৎচরের ফর্দানিয়া বাড়ির প্রয়াত আব্দুর রাশিদ ভূঁইয়ার পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের আট ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র ছোট সন্তান হওয়ায় নাঈমকে ঘিরে পরিবারের আবেগও আলাদা। হেলিকপ্টার অবতরণের পর স্বজন ও স্থানীয়রা ফুল দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেন। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জুনে কাতারে যান নাঈম। এরপর ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবরের দিকে পাড়ি জমান পোল্যান্ডে। বর্তমানে তিনি পোল্যান্ডে অবস্থান করছেন এবং সেখানে তাঁর ছোট একটি ব্যবসা রয়েছে।
নাঈম বলেন, মা, পরিবার এবং নিজের একটি শখ পূরণ করতেই এবার একটু ভিন্নভাবে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাই ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সরাসরি হেলিকপ্টারে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। বাড়ির পাশের ধানখেতেই করা হয় হেলিকপ্টার অবতরণের ব্যবস্থা।
হেলিকপ্টার নামার খবর ছড়িয়ে পড়লে পশ্চিম জগৎচরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ সেখানে ছুটে আসেন। কেউ হেলিকপ্টারের ছবি তুলেছেন, কেউ আবার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেছেন। প্রবাসী নাঈমকে ফুলের মালা ও ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান স্বজন ও স্থানীয়রা।
তবে আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যেও হেলিকপ্টার অবতরণের অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাঈম।
তিনি বলেন, হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে যে ধাপে ধাপে এত জায়গায় গিয়ে অনুমতি নিতে হবে, তা আমার জানা ছিল না। আমি একজন প্রবাসী এবং এই দেশের একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। নিজের থানা প্রশাসন থাকা সত্ত্বেও হেলিকপ্টারের অনুমতির জন্য আমার পরিবারকে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে যেতে হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আগে জানলে হয়তো হেলিকপ্টার ভাড়াই করতাম না।
নাঈম আরও বলেন, এ ধরনের জটিলতার কারণে তাঁর মতো অন্য প্রবাসীদেরও স্বপ্ন নষ্ট হতে পারে। বিষয়টি সহজ করা হলে প্রবাসীরা দেশে ফিরে নিজেদের স্বপ্ন ও পরিবারের ইচ্ছাগুলো আরও সহজে পূরণ করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।
মা আয়েশা খাতুন বলেন, ছেলে বিদেশে থাকে, তাই সবসময়ই তাকে নিয়ে চিন্তা হয়। নাঈম ছোট ছেলে, ও হেলিকপ্টারে করে বাড়ি আসবে, এটা আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল। আমার ছেলের মাধ্যমে আল্লাহ আমার একটা স্বপ্ন পূরণ করেছেন। ছেলে সুস্থভাবে দেশে ফিরে আমার কাছে এসেছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!
নাঈমের বড় ভাই কবির হোসেন বলেন, আমরা আট ভাইবোন। নাঈম সবার ছোট, তাই ছোটবেলা থেকেই ওকে আমরা সবাই একটু বেশি আদর করি। বিদেশে থাকার পরও পরিবারের প্রতি ওর টান সবসময় ছিল। মায়ের হেলিকপ্টারে করে ছেলেকে বাড়ি ফেরার ইচ্ছাটা নাঈম মনে রেখেছিল। হেলিকপ্টার যখন বাড়ির পাশে ধানখেতে নামল, তখন আমাদের পুরো পরিবার আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল।
প্রবাস থেকে সাধারণত বিমান ও সড়কপথে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন মানুষ। তবে মায়ের স্বপ্ন পূরণে হেলিকপ্টারে করে সরাসরি গ্রামের ধানখেতে নেমে বাড়ি ফেরার ঘটনা কুলিয়ারচরে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাঈমের এই ব্যতিক্রমী প্রত্যাবর্তন যেমন পরিবারের জন্য আনন্দের, তেমনি স্থানীয় মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে স্মরণীয় এক ঘটনা।





















