দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে গবেষণাগার থেকে বাজারমুখী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ মেলায় দেশের শতাধিক উদ্ভাবক, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করছে। তিনদিনব্যাপী শুরু হওয়া মেলার আজ শেষ দিন।
‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আয়োজকদের মতে, উদ্ভাবনকে শুধু প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পখাত, বিনিয়োগ এবং বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার মাধ্যমে দেশের উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশেষভাবে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ১২টি উদ্ভাবনী পণ্য ও প্রযুক্তি। কৃষি, খাদ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, পরিবেশ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এসব উদ্ভাবন দর্শনার্থী, গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এনামুল্যা এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. নওশের ওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টল পরিদর্শন করেন। স্টল ঘুরে দেখে তারা প্রদর্শিত উদ্ভাবনসমূহের কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
স্টল পরিদর্শন শেষে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক পর্যবেক্ষণমূলক মন্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এনামুল্যা বলেন, মেলায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণ, স্টলের সংখ্যা, উপস্থাপনা এবং প্রদর্শনীর নান্দনিকতা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ। অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনের মান অনেক ক্ষেত্রেই অসাধারণ হলেও তাদের প্রদর্শনী ও উপস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা মেলায় অংশগ্রহণের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পাননি। ফলে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের নানা ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হয়েছে। বিপরীতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উদ্ভাবন প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করেছে, যার প্রতিফলন তাদের স্টল ও উপস্থাপনায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
উপাচার্য প্রশ্ন তোলেন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া গবেষকরা কীভাবে তাদের গবেষণা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, উদ্ভাবিত প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাবেন কিংবা পেটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের পর্যায়ে পৌঁছাবেন? গবেষণা ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য আর্থিক সহায়তাকে তিনি অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।
তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে বিশেষ প্রণোদনা, অনুদান ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা উচিত। কারণ দেশের মৌলিক গবেষণার বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে।
উপাচার্যের মতে, ইনোভেশন ফেয়ারের মতো আয়োজনকে সত্যিকার অর্থে সফল ও অর্থবহ করতে হলে শুধু উদ্ভাবন প্রদর্শন করলেই হবে না; বরং সেই উদ্ভাবনকে বাস্তব প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বাজারজাতকরণের পর্যায়ে নিয়ে যেতে কার্যকর নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের যুগে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।





















