সরকার শাহাদত হোসেন :
একসময় ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামবাংলার কৃষকের কাঁধে উঠত লাঙল-জোয়াল, হাতে থাকত গরুর দড়ি। সঙ্গে থাকত এক জোড়া বলদ। ‘হেইও ডান ডান’ ডাক দিয়ে কৃষক ছুটতেন মাঠের দিকে। শিশিরভেজা জমিতে বলদের পায়ের শব্দ আর লাঙলের ফলা দিয়ে মাটি চাষের দৃশ্য ছিল গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা ছবি। কৃষকের স্ত্রী কিংবা ছেলে-মেয়েরা দুপুরে গামছায় খাবার বেঁধে নিয়ে যেতেন মাঠে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের দাপটে গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলাতেই গরুর হাল এখন খুব কম চোখে পড়ে।
বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একসময় প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেই ছিল গরুর হাল। মৌসুমি ফসল, বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের তরিতরকারি চাষ এবং বীজতলা তৈরিতে গরুর হাল ছিল কৃষকের অন্যতম ভরসা। কিন্তু গত ১৫ থেকে ২০ বছরে কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গরুর হালের প্রচলন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা। কারণ, পাওয়ার টিলার কিংবা ট্রাক্টর দিয়ে বড় জমি চাষ করা সহজ হলেও খণ্ড খণ্ড উঁচু-নিচু জমিতে সেগুলো ব্যবহার করা অনেক সময় ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। আবার প্রয়োজনের সময় যন্ত্রচালিত হাল না পাওয়ায় মৌসুমি ফসলের আবাদও ব্যাহত হচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের কৃষক তারা মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগেও তিনি খণ্ড খণ্ড উঁচু জমিতে এক বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের তরিতরকারি চাষ করে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ করতেন। তখন গরুর হাল দিয়ে সহজেই জমি প্রস্তুত করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে পাওয়ার টিলার দিয়ে ছোট ছোট জমি চাষ করানো কঠিন। অনেক সময় টিলার মালিকেরা এসব ছোট জমিতে চাষ করতে আসতে চান না। ফলে সময়মতো জমি প্রস্তুত করতে না পেরে তিনি শেষ পর্যন্ত তরিতরকারি চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গরুর হাল থাকলে যখন প্রয়োজন তখনই জমি চাষ করা যেত। এখন যন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো জমি চাষ করতে না পারলে ফসলের মৌসুমই চলে যায়।
অন্যদিকে গরুর হালের মালিক আব্দুল কাদের জানান, বর্তমানে গরু কেনা, লালন-পালন ও কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। গরুর খাবার ও পরিচর্যার খরচও বেশি। অথচ সারা বছর গরুর হালের তেমন কাজ থাকে না। মূলত মৌসুমি তরিতরকারির জমি ও বীজতলা তৈরির সময় গরুর হালের প্রয়োজন হয়। তাই শুধু এই কাজের জন্য গরু পালন করে হাল ধরে রাখা এখন আর লাভজনক মনে হয় না।
শুধু সুন্দরগঞ্জ নয়, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার গ্রামাঞ্চলেও গরুর হালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলার চক ভগবানপুর গ্রামের রহমান পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, এখন আর আগের মতো গরুর হাল চোখে পড়ে না। নব্বইয়ের দশকে খুব ভোরে পানতা ভাত খেয়ে কৃষকেরা লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে বলদসহ মাঠে যেতেন। দুপুরে বাড়ির লোকজন গামছায় খাবার বেঁধে নিয়ে মাঠে পৌঁছে দিতেন। বর্ষাকালে গরুর হালের পেছনে পেছনে জমিতে মাছ ধরতাম। আবার শুকনো মৌসুমে হাঁসের খাবারের জন্য শামুক কুড়াতাম। কত আনন্দই না ছিল সেই দিনগুলোতে! এখন সেসব স্মৃতি মনে পড়লে মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার কৃষিকাজকে সহজ, দ্রুত ও শ্রমসাশ্রয়ী করেছে। তবে ছোট ও বিচ্ছিন্ন জমিতে চাষাবাদের ক্ষেত্রে সব সময় যন্ত্রের ব্যবহার সুবিধাজনক হয় না। বিশেষ করে বীজতলা তৈরি, সবজি চাষ এবং ছোট জমি প্রস্তুতের জন্য কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট আকারের কৃষিযন্ত্র ও বিকল্প চাষপদ্ধতি সহজলভ্য করা জরুরি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ রেজ-ই মাহমুদ জানান, আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে গরুর হালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। আগের মতো এখন আর গরুর হাল তেমন দেখা যায় না। তবে বীজতলা তৈরি ও বিভিন্ন ধরনের তরিতরকারির জমি চাষের ক্ষেত্রে গরুর হালের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে।
একসময় যে গরুর হাল ছিল কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী, আজ তা কেবল স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে। আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় কৃষিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ক্ষুদ্র কৃষকদের বাস্তব সমস্যাগুলোরও সমাধান প্রয়োজন। ছোট জমি চাষের উপযোগী সাশ্রয়ী কৃষিযন্ত্রের ব্যবস্থা এবং কৃষকদের প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে মৌসুমি ফসলের আবাদে নতুন করে আগ্রহ ফিরে আসতে পারে।
নইলে একদিন হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে ‘লাঙল-জোয়াল’, ‘বলদের হাল’ আর কৃষকের সেই ‘হেইও ডান ডান’ ডাক কেবল গল্পের বিষয় হয়েই থাকবে।




















