নেত্রকোনায় নির্বিচারে শামুক ধরার ফলে হুমকির মুখে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য

নেত্রকোনায় নির্বিচারে শামুক ধরার ফলে হুমকির মুখে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য
নেত্রকোনা জেলার হাওর জনপদ মোহনগঞ্জে সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী ডিঙ্গাপোতা হাওর অবস্থিত। জীবিকার তাগিদে বর্ষা আসার পর থেকেই এলাকার নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ব্যস্ত শামুক ধরার কাজে। দিনে রাতে জাল,জালি ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তারা ছোটবড় শামুক ধরে বস্তাভর্তি করে।
তারপর এসব শামুক বিক্রি করে বিভিন্ন হাঁসের খামারে।এতে হাওর অঞ্চলে অনেকের কোন রকমে জীবন জীবিকা চলছে। নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক ধরার ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের হাটে বসছে শামুক বিক্রির পাইকারি বাজার। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে, হাঁসের খামারের মালিক এসব শামুক ক্রয় করছেন। হাওর পাড়ের খামারগুলোতে শামুক হাঁসের জন্য এক পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।
দিনে রাতে ধরে শত শত বস্তা শামুক হাওর পাড়ের হাটে জমা করে রাখা হয়। অল্প খরচে হাঁসের পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় ঝ খাবার হিসেবে কাছে শামুকের চাহিদা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক হাওর থেকে ধরার ফলে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। দেশীয় মাছের মতো শামুক একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তবে এভাবে নিয়মিত নির্বিচারে শামুক ধরার ফলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য,প্রকতির একটি প্রজাতির জীব অপর একটি প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। এটি কোনভাবেই প্রকতির সুফল বয়ে আনবে না। এজন্য এখন থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে তাদের অভিমত।
জানতে চাইলে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘শিক্ষা সংস্কৃতি পরিবেশ ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র সভাপতি নাজমুল কবির সরকার বলেন, শামুক শুধু হাঁসের খাবার নয়, অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছের ও খাদ্য।প্রতিদিন এভাবে শামুক আহরণ করা হলে দেশীয় মাছের খাদ্যের অভাব দেখা দেবে। দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ আর ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।এর বিশাল প্রভাব পড়বে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণির অস্তিত্বের ওপরে।
তিনি আরও জানান, ছোট বড় শামুক ধরার ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতে হাওরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি একসময় প্রজাতিটি বিলুপ্ত হওয়ার বড়ো ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের শামুক কেবল হাঁসের খাদ্য নয়; এটি হাওরের সূক্ষ্ম খাদ্যশৃঙ্খল ও জলজ পরিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। মাছসহ নানা জলচর প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে এবং পানির গুণগত মান রক্ষায় শামুকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দিনের পর দিন এভাবে নির্বিচার আহরণ অব্যাহত থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেত্রকোনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন জানান, পরিবেশে কোনো একটি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় ধ্বংস করা হলে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ফলে হাওরে শ্রমিকদের নির্বিচারে শামুক ধরার বিষয়টি একদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমিক শ্রেণির জীবিকার সুবিধা ভোগ করছে। আবার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত শামুক ধরার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পদক্ষেপ গ্ৰহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
জনপ্রিয়
বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

বগুড়া আদালতে দ্বন্দ্বের মাশুল বিচারপ্রার্থীদের—ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হোক বিচারিক কার্যক্রম

নেত্রকোনায় নির্বিচারে শামুক ধরার ফলে হুমকির মুখে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য

আপডেট সময় : ১২:০০:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেত্রকোনা জেলার হাওর জনপদ মোহনগঞ্জে সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী ডিঙ্গাপোতা হাওর অবস্থিত। জীবিকার তাগিদে বর্ষা আসার পর থেকেই এলাকার নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ব্যস্ত শামুক ধরার কাজে। দিনে রাতে জাল,জালি ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তারা ছোটবড় শামুক ধরে বস্তাভর্তি করে।
তারপর এসব শামুক বিক্রি করে বিভিন্ন হাঁসের খামারে।এতে হাওর অঞ্চলে অনেকের কোন রকমে জীবন জীবিকা চলছে। নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক ধরার ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের হাটে বসছে শামুক বিক্রির পাইকারি বাজার। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে, হাঁসের খামারের মালিক এসব শামুক ক্রয় করছেন। হাওর পাড়ের খামারগুলোতে শামুক হাঁসের জন্য এক পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।
দিনে রাতে ধরে শত শত বস্তা শামুক হাওর পাড়ের হাটে জমা করে রাখা হয়। অল্প খরচে হাঁসের পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় ঝ খাবার হিসেবে কাছে শামুকের চাহিদা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক হাওর থেকে ধরার ফলে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। দেশীয় মাছের মতো শামুক একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তবে এভাবে নিয়মিত নির্বিচারে শামুক ধরার ফলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য,প্রকতির একটি প্রজাতির জীব অপর একটি প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। এটি কোনভাবেই প্রকতির সুফল বয়ে আনবে না। এজন্য এখন থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে তাদের অভিমত।
জানতে চাইলে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘শিক্ষা সংস্কৃতি পরিবেশ ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র সভাপতি নাজমুল কবির সরকার বলেন, শামুক শুধু হাঁসের খাবার নয়, অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছের ও খাদ্য।প্রতিদিন এভাবে শামুক আহরণ করা হলে দেশীয় মাছের খাদ্যের অভাব দেখা দেবে। দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ আর ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।এর বিশাল প্রভাব পড়বে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণির অস্তিত্বের ওপরে।
তিনি আরও জানান, ছোট বড় শামুক ধরার ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতে হাওরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি একসময় প্রজাতিটি বিলুপ্ত হওয়ার বড়ো ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের শামুক কেবল হাঁসের খাদ্য নয়; এটি হাওরের সূক্ষ্ম খাদ্যশৃঙ্খল ও জলজ পরিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। মাছসহ নানা জলচর প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে এবং পানির গুণগত মান রক্ষায় শামুকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দিনের পর দিন এভাবে নির্বিচার আহরণ অব্যাহত থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেত্রকোনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন জানান, পরিবেশে কোনো একটি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় ধ্বংস করা হলে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ফলে হাওরে শ্রমিকদের নির্বিচারে শামুক ধরার বিষয়টি একদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমিক শ্রেণির জীবিকার সুবিধা ভোগ করছে। আবার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত শামুক ধরার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পদক্ষেপ গ্ৰহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।