মাইক হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন মেসি।
‘আজকের দিনে কিছু বলা সত্যিই কঠিন; অনেক আবেগ, অনেক স্মৃতি মনের ভেতর ভিড় করে আসছে। সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে। আমার বিদায়ী চিঠিতে যেভাবে বলেছিলাম, আমি শুধু আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সির প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য এক চরম সম্মানের বিষয় ছিল। কঠিনতম মুহূর্তগুলোতেও আমি কখনও লড়াই থামাইনি, নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়া বন্ধ করিনি এবং দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। এই আকাশি-সাদা আঙিনায় আর ফিরে না আসার বেদনাটা হবে বিশাল। স্রষ্টার কসম, জীবনের বাকিটা সময়ও আমি এখানে ফিরে আসতে চাইতাম, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতানো একজন ফুটবলারের জীবনে ঘটা সবচেয়ে দারুণ অনুভূতি।
‘যদিও মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যাই, তবে আমার মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়। গত বিশ্বকাপটি আমার জন্য অনেক বেশি মানসিক ও শারীরিক চাপের ছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, জয়ের একদম কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম, আর সত্যি বলতে অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আমরা আমাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের দৈহিক ও মানসিকভাবে ভীষণ নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে লড়াইটি টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা যথারীতি লড়াই করেছি, যেমনটা এই জার্সির জন্য সবসময় করে এসেছি—আমার সেইসব সতীর্থদের সাথে নিয়ে যাদের পাশে পেয়েছি। এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখবেন না যে, আমার পাশে থাকা প্রতিটি সতীর্থ এই শার্টের জন্য সর্বদা তাদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়েছে।
‘আমার এই দলটির সাথে কাটানো সময়ের জন্য সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার শৈশবের স্বপ্নপূরণে সাহায্য করেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন, ফিনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন, অর্থাৎ যা যা প্রতিযোগিতায় খেলেছি সবকিছুর বিশ্বজয়ী বানিয়েছে। মাঠ এবং মাঠের বাইরে তাদের সাথে মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া ছিল আমার জীবনের বড় এক প্রাপ্তি। আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত ছিলাম, কারণ আমি জানতাম আমার চারপাশে এমন কিছু বীর যোদ্ধা রয়েছে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়বে।
‘এখানে খেলাটা আমি বড্ড মিস করব। পুরো দেশজুড়ে ভ্রমণের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল এবং প্রতিটা জায়গায় আমি অবিশ্বাস্য ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। যা যা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। ম্যাচ যাই হোক না কেন—বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা যেখানেই গিয়েছি, গ্যালারি সবসময় কানায় কানায় পূর্ণ রাখার জন্য আমি ধন্য। অনেক কষ্ট করে সমর্থকরা এসেছিলেন, আমরা জানি এটা কতটা কঠিন, কিন্তু যেখানেই খেলেছি মনে হয়েছে নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি। আমরা সত্যিই সেই ভালোবাসা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছি।
‘এই মাঠেই আমি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের এক দিন উদযাপন করেছিলাম—বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আমরা আবার খেলতে নেমেছিলাম। সেদিন যা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা আমি জীবনেও ভুলব না। পুরো বিষয়টি ছিল অপরূপ সুন্দর। আজ অব্দি আমি যখনই সেই স্মৃতিগুলোর ভিডিও দেখি, আবেগে ভেসে যাই। সেই দিনটি আমার ইতিহাসে, আমার পরিবারের ইতিহাসে এবং সমর্থকদের ইতিহাসে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে… এটা সত্যি অসাধারণ ছিল, আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।
‘আজ আবার এই মাঠে ফিরে এসে, আমি নিঃসন্দেহে আমার ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিষাদময় দিনটি পার করছি। কারণ আজ সেই দিন, যেদিন আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে লড়াই করাটা আমি খুব মিস করব। তবে এখন থেকে আমি আপনাদের পাশে ওপারে দাঁড়াব—এই তরুণদের এবং সামনে যারা আসবে, তাদের সবাইকে সমর্থন জুগিয়ে যাব। আমরা সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকব।
‘এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, আমরা যখন একত্রিত হই এবং একতাবদ্ধ থাকি, তখন আমরা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি এবং যেকোনো কিছু জয় করতে পারি। সামনে নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসছে, কারণ এই সময়ে আমরা যা যা অর্জন করেছি তা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে আমাদের আরও বেশি করে ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে, সমর্থন জোগাতে হবে। আমি ওদেরকে যেমনটা সবসময় বলি, আর আমাদের শেষ বৈঠকেও যেটা বলেছি: মহৎ কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলা জরুরি; কারণ কিছু মানুষ সবসময় ওৎ পেতে থাকে জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখার জন্য। আমাদের কোনোভাবেই তাদের সেই সন্তুষ্টি দেওয়া যাবে না।
‘প্রতিকূল ও কঠিন সময়গুলোতেই বোঝা যায় একটি দলের ভেতরে কতটা শক্তি লুকিয়ে আছে। ভেতরে যখন দলের বাঁধন শক্ত না হয়, তখন কোনো কিছু অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর বিশ্বাস করুন, আমরা ছিলাম একটি অসাধারণ একতাবদ্ধ দল—আর সে কারণেই আমরা যা যা অর্জন করেছি তা সম্ভব হয়েছে।
‘সত্যি বলতে, আজ আমি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আসলে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, এই সবুজ গালিচা ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই—আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি, আমি আপনাদের খুব মিস করব। একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি ঈশ্বরের কাছে চিরকৃতজ্ঞ, আমি আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত এবং আপনাদের সকলকে সাথে নিয়ে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরে আমি পরম গর্বিত।
আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’
























