ফুটবলের আকাশে কি তবে সত্যিই অস্ত যাচ্ছে এক নক্ষত্রের আলো? ইতিহাসের পাতায় শেষ হতে চলেছে মেসি যুগের এক অধ্যায়। ফাঁকা হয়ে যাবে ফুটবলের সেই রাজপ্রাসাদ, যেখানে বছরের পর বছর জাদুর ছড়ি ঘুরিয়েছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার বিদায়ের ক্ষণে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে তাই হাহাকার—সবুজ গালিচায় কি আর কখনো দেখা যাবে সেই পরিচিত বাঁ পায়ের মায়াবী জাদু?
বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক এল মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই নিছক ৯০ মিনিটের একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি যেন এক বর্ণিল ফুটবল-কাব্যের শেষ অধ্যায়। হাজারো স্মৃতি, অসংখ্য রেকর্ড আর আবেগের স্রোতে ভেসে এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।
যে খেলাকে মেসি তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় শিল্পে পরিণত করেছিলেন, তাঁর বিদায়ের পর সেই সৌন্দর্য কি আর কখনো আগের মতো দেখা যাবে? রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে শৈশবে হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল কিংবদন্তি।
২০০৫ সালে বার্সেলোনার হয়ে পেশাদার ফুটবলে পা রাখার পর থেকেই মেসি লিখেছেন একের পর এক রূপকথার গল্প। কাতালান ক্লাবটির হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল এবং ৩৫টি শিরোপা জয়ের অসাধারণ কীর্তি গড়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত সাফল্যের মুকুটে রয়েছে রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর।
মেসির ফুটবল শুধু গোল কিংবা জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যান নয়। তাঁর প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি পাস, প্রতিটি ফ্রি-কিক যেন ফুটবলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। মাঠের সবুজ ঘাসকে তিনি পরিণত করেছেন শিল্পীর ক্যানভাসে।
বার্সেলোনার দীর্ঘ অধ্যায় শেষে পিএসজি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে পাড়ি জমালেও থামেনি তাঁর গোলের ক্ষুধা। বয়স বাড়লেও কমেনি তাঁর সৃজনশীলতা কিংবা ফুটবলীয় প্রভাব। ক্যারিয়ারে ৯০০-এর বেশি অফিশিয়াল গোল এবং ৪০০-এর বেশি অ্যাসিস্টের অসাধারণ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান কতটা অনন্য।
অপেক্ষার অবসান আন্তর্জাতিক ফুটবলে
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির পথচলাও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। একের পর এক হতাশা, ফাইনালে হার এবং সমালোচনার মধ্যেও থামেননি তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে সাফল্যের অপেক্ষা শেষ হয় ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে।
এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নেন মেসি। পূর্ণতা পায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। আকাশি-সাদা জার্সিতে ১৮০-এর বেশি ম্যাচে ১০০-এর বেশি গোল করে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়।
আর এবার সেই ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে ফুটবলবিশ্ব।
ঐতিহাসিক এল মনুমেন্তালের গ্যালারিতে যখন হাজারো কণ্ঠে উচ্চারিত হবে মেসির নাম, তখন আবেগে ভারী হয়ে উঠবে বাতাস। চেনা ১০ নম্বর জার্সি, বাঁ পায়ের নিখুঁত শট, অসাধারণ পাস আর প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্যগুলো হয়তো শেষবারের মতো দেখবেন দর্শকরা।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে একটি যুগ। শেষ হবে মাঠে মেসির নিয়মিত উপস্থিতির অপেক্ষা। কিন্তু শেষ হবে না তাঁর গল্প।
কারণ মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ, একটি যুগের প্রতীক। তাঁর পায়ের জাদু, অসংখ্য গোল, ট্রফি, রেকর্ড আর অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলো থেকে যাবে ফুটবলের ইতিহাসে।
মেসি হয়তো একদিন সবুজ ঘাস ছেড়ে যাবেন, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় থেকে তাঁর নাম মুছে যাবে না। সময় পেরিয়ে যাবে, নতুন তারকারা আসবেন, নতুন রেকর্ড তৈরি হবে—তবুও ফুটবলের ইতিহাসে মেসি নামটি থেকে যাবে এক অনন্ত মায়ার মতো।
মাঠ ছাড়বেন মেসি, কিন্তু শেষ হবে না মেসির গল্প।


























