নাইন ইলেভেনের পর ফের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ পথে ট্রাম্প

নাইন ইলেভেনের পর ফের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ পথে ট্রাম্প

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াবেন না—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে ক্ষমতায় ফিরে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এটিই ট্রাম্পের নিজস্ব ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হয়ে উঠতে পারে।

১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। দীর্ঘ এসব যুদ্ধ থেকে ওয়াশিংটন কতটা শিক্ষা নিয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট কৌশল আছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ও অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তা ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আরও গভীর সংঘাতের উত্তরাধিকার বহন করতে হতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান অভিযান ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মতো নয়। ওই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু সরকার উৎখাত করে হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করেছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। বিপরীতে ইরানের ক্ষেত্রে মূলত আকাশ ও নৌ শক্তির ওপর নির্ভর করছে ওয়াশিংটন।

এই হামলায় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও দেশটিকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের আহ্বানে ইরানিরাও তাদের শাসকদের উৎখাত করতে এগিয়ে আসেনি।

ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতটি এখন ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। মাঝেমধ্যে বড় ধরনের হামলাও হচ্ছে। সর্বশেষ তেলবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। পাশাপাশি তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে। যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনে ইরানের বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে একই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস একমাত্র ট্রাম্পই দেখিয়েছেন। তার ভাষ্য, ট্রাম্প যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্র অবরোধ জোরদারের ফলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে ইরানের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে তুলনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘ যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করেছিল, তার অন্যতম শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার কঠিন বাস্তবতা।

নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে ইরাকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে গোয়েন্দা তথ্যকে যুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের ওই দুই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

এর বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের ক্ষোভই এক দশক আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানে ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সময়ও ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

সমালোচকদের মতে, এই অভিযানের পেছনে ১১ সেপ্টেম্বরের মতো কোনো জাতীয় সংকট ছিল না; বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের যুদ্ধ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল—ট্রাম্পের এই দাবিও বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

ইরানের প্রতিরোধের ধরনকে আফগানিস্তানে তালেবানের কৌশলের সঙ্গেও তুলনা করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, একটি দৃঢ় প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চাপ দীর্ঘ সময় সহ্য করতে পারে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগে বুশ প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিল। পরে সেই সমর্থন কমে যায়। বিপরীতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প খুব কম পরামর্শ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে এগিয়েছেন। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশের নেতাই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।

ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদের ওপরও ছড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব বেড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি যুদ্ধ থেকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, যা তারা নিজেরা চায়নি।

সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় শুরু হওয়া যুদ্ধগুলোর কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী জনসমর্থন থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরু থেকেই তেমন সমর্থন পায়নি। এমনকি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও এ যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন।

ট্রাম্প শুরুতে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। যুদ্ধ এখন অস্বস্তিকর অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাসহ ট্রাম্পের ঘোষিত বিভিন্ন লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমেছে।

তবে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমর্থকও রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক দুবোভিৎস মনে করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অন্তহীন যুদ্ধে ফেলেননি। তার দাবি, ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাফল্য অর্জন করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দিতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

জনপ্রিয়
পঞ্চগড়ে স্কুল ফিডিংয়ের পাউরুটিতে মিলল ব্লেড: ষড়যন্ত্র নাকি অবহেলা, তদন্তে প্রশাসন

পঞ্চগড়ে স্কুল ফিডিংয়ের পাউরুটিতে মিলল ব্লেড: ষড়যন্ত্র নাকি অবহেলা, তদন্তে প্রশাসন

নাইন ইলেভেনের পর ফের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ পথে ট্রাম্প

আপডেট সময় : ১২:৪২:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াবেন না—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে ক্ষমতায় ফিরে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এটিই ট্রাম্পের নিজস্ব ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হয়ে উঠতে পারে।

১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। দীর্ঘ এসব যুদ্ধ থেকে ওয়াশিংটন কতটা শিক্ষা নিয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট কৌশল আছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ও অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তা ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আরও গভীর সংঘাতের উত্তরাধিকার বহন করতে হতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান অভিযান ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মতো নয়। ওই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু সরকার উৎখাত করে হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করেছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। বিপরীতে ইরানের ক্ষেত্রে মূলত আকাশ ও নৌ শক্তির ওপর নির্ভর করছে ওয়াশিংটন।

এই হামলায় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও দেশটিকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের আহ্বানে ইরানিরাও তাদের শাসকদের উৎখাত করতে এগিয়ে আসেনি।

ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতটি এখন ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। মাঝেমধ্যে বড় ধরনের হামলাও হচ্ছে। সর্বশেষ তেলবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। পাশাপাশি তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে। যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনে ইরানের বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে একই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস একমাত্র ট্রাম্পই দেখিয়েছেন। তার ভাষ্য, ট্রাম্প যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্র অবরোধ জোরদারের ফলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে ইরানের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে তুলনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘ যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করেছিল, তার অন্যতম শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার কঠিন বাস্তবতা।

নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে ইরাকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে গোয়েন্দা তথ্যকে যুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের ওই দুই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

এর বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের ক্ষোভই এক দশক আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানে ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সময়ও ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

সমালোচকদের মতে, এই অভিযানের পেছনে ১১ সেপ্টেম্বরের মতো কোনো জাতীয় সংকট ছিল না; বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের যুদ্ধ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল—ট্রাম্পের এই দাবিও বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

ইরানের প্রতিরোধের ধরনকে আফগানিস্তানে তালেবানের কৌশলের সঙ্গেও তুলনা করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, একটি দৃঢ় প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চাপ দীর্ঘ সময় সহ্য করতে পারে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগে বুশ প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিল। পরে সেই সমর্থন কমে যায়। বিপরীতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প খুব কম পরামর্শ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে এগিয়েছেন। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশের নেতাই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।

ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদের ওপরও ছড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব বেড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি যুদ্ধ থেকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, যা তারা নিজেরা চায়নি।

সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় শুরু হওয়া যুদ্ধগুলোর কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী জনসমর্থন থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরু থেকেই তেমন সমর্থন পায়নি। এমনকি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও এ যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন।

ট্রাম্প শুরুতে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। যুদ্ধ এখন অস্বস্তিকর অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাসহ ট্রাম্পের ঘোষিত বিভিন্ন লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমেছে।

তবে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমর্থকও রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক দুবোভিৎস মনে করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অন্তহীন যুদ্ধে ফেলেননি। তার দাবি, ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাফল্য অর্জন করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দিতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স