ইয়াকুব সরকার | বিশেষ প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম
অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কখনো হোটেলে বয়ের কাজ, কখনো দিনমজুরি, আবার কখনো টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। সংসারে অভাব, মাথার ওপর ঋণের বোঝা, থাকার মতো নিজস্ব ঘরও নেই। তবু দারিদ্র্যের কাছে হার মানেননি বিশাল সরকার কৌশিক। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি।
কিন্তু এই সাফল্যের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কৌশিকের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া হলেও মেডিকেলে ভর্তি ও পরবর্তী পড়াশোনার ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই তাঁর পরিবারের। ফলে মেধার স্বীকৃতি মিললেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পুরো পরিবার।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারসংলগ্ন এলাকায় অন্যের জমিতে ছোট্ট ভাঙাচোরা চালাঘরে বসবাস কৌশিকদের। পুরোনো টিনের ছাউনি, জরাজীর্ণ বসতঘর আর অনিশ্চিত জীবন—এই বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন তিনি।
শৈশব থেকেই মেধাবী কৌশিক পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেন। পরে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতেও জিপিএ-৫ পান। এরপর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে এবার এইচএসসিতেও ধরে রাখেন সেই সাফল্য।
কৌশিকের মা কণা রানী স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে আয়ার কাজ করেন। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থ শরীর নিয়েও সপ্তাহে দুই দিন হাটে ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। সামান্য এই আয় দিয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
পরিবারটি বর্তমানে এনজিও ঋণের চাপে জর্জরিত। গ্রামীণ ব্যাংক ও আশা থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। কিস্তির চাপ সামলাতে গিয়ে আরও ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছে পরিবারটি।
কৌশিক জানান, অর্থাভাবে অনেক দিন স্কুল-কলেজে যেতে পারেননি। কখনো অটোভাড়া ছিল না, কখনো না খেয়েই কাটাতে হয়েছে পুরো দিন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট শিক্ষক রাখার সুযোগ হয়নি। পরে কয়েকজন শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। নিজের খরচ চালাতে হোটেল বয়ের কাজও করেছেন।
তিনি বলেন, “চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছি। কিন্তু পরিবারের অবস্থা খুব খারাপ। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে হোটেলে কাজ করেছি। শিক্ষকদের সহযোগিতা না পেলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।”
কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার বলেন, ২০২০ সালে উচ্ছেদ অভিযানে তাঁদের চায়ের দোকান ও বসতঘর হারিয়ে যায়। এরপর থেকে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন। বড় ছেলে কলেজে পড়ছেন, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন ছোট ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চালাবেন, তা ভেবেই দিশেহারা তিনি।
বড় ভাই কর্ণ সরকার বলেন, ছোট ভাইয়ের সাফল্যে পরিবারের গর্ব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে—এই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
মা কণা রানী বলেন, “আমার ছেলে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। আমরা চাই ও ডাক্তার হোক। কিন্তু সেই সামর্থ্য আমাদের নেই। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে ওর স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।”
অভাব, ক্ষুধা আর সংগ্রামকে জয় করে কৌশিক যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক মেধাবী তরুণের অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী সহায়তা, যাতে অর্থের অভাবে থেমে না যায় তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।



















