পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ৩৬ বছরের পথচলা। যে বিদ্যালয়ের আঙিনায় কেটেছে জীবনের সোনালি সময়, যে শ্রেণিকক্ষে হাজারো শিশুর মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষার আলো, সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণ ছেড়ে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে আর ধরে রাখতে পারলেন না চোখের জল। কাঁপা কণ্ঠে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শেষবারের মতো কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষক শামসুন নেহার। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। সেই কান্নায় মিশে ছিল দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতি, প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা আর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার গভীর তৃপ্তি।
সোমবার (২ নভেম্বর) পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার কলোনীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. শামসুন নেহারের অবসর উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এমনই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিনে ফুল, সম্মাননা আর ভালোবাসায় তাঁকে বিদায় জানান সহকর্মী, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসী। বিদায় অনুষ্ঠান শেষে মাইক্রো করে সম্মানের সঙ্গে তাঁকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
১৯৯০ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়েছিলেন শামসুন নেহার। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৬ বছর। সময়ের পরিক্রমায় বদলেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, পাল্টেছে শিক্ষার্থীদের প্রজন্ম। একসময়ের ছোট্ট শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বদলায়নি শিক্ষার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কিংবা দায়িত্ববোধ। জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রতিকূলতা আর ব্যক্তিগত শোককে সঙ্গী করেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব।
তাঁর এই দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য বিদায় সংবর্ধনার। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সাজানো হয় উৎসবের আমেজে। প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষ কর্মদিবসে সম্মান জানাতে উপস্থিত হন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ফুলেল শুভেচ্ছা, মানপত্র, সম্মাননা স্মারক ও বিভিন্ন উপহার তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শামীমের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আলী, সহকারী শিক্ষক আব্দুল মজিদ, দেলোয়ার হোসেন ও উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আশিক ইকবালসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
শামসুন নেহারের শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও ত্যাগের গল্পও। তাঁর স্বামী নজরুল ইসলাম পেশায় একজন ব্যাংকার ছিলেন। কয়েক বছর আগে স্বামীর মৃত্যুতে জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও থেমে থাকেননি তিনি। ব্যক্তিগত বেদনা আড়াল করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে এসেছেন, পাঠদান করেছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। নিজের কষ্টের চেয়ে বড় করে দেখেছেন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বকে।
বিদায় অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শামসুন নেহার। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, প্রিয় শিক্ষার্থী আর চেনা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই স্কুলটিই ছিল আমার সবকিছু। শিশুদের কচি মুখগুলোর মাঝেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার জীবনকে। আজ শারীরিকভাবে চলে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনটা এই প্রাঙ্গণেই পড়ে রইল। আমি কথা দিচ্ছি, সপ্তাহে অন্তত একটি দিন হলেও আমি এই প্রাঙ্গণে ফিরে আসব।’
তাঁর এমন আবেগঘন বক্তব্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার বেদনার মধ্যেও প্রিয় শিক্ষিকার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিদায় অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
অনুষ্ঠান শেষে আসে বিদায়ের সেই ক্ষণ। যে বিদ্যালয়ে প্রতিদিন এসেছেন শিক্ষার্থীদের মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে, সেই বিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে এবার বিদায় নিতে হয় তাঁকে। তবে বিদায়টি ছিল ব্যতিক্রমী। সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁকে সুসজ্জিত প্রাইভেটকারে বসিয়ে সম্মানের সঙ্গে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও শামসুন নেহারের রেখে যাওয়া শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসার স্মৃতি রয়ে যাবে তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে।
তেঁতুলিয়ার এই প্রান্তিক জনপদে একজন শিক্ষকের প্রতি এমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ যেন মনে করিয়ে দিল—শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার এক মহান ব্রত। কর্মজীবনের একদিন অবসান ঘটে, কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান কখনো অবসরে যায় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর শিক্ষার আলো বয়ে নিয়ে চলে।
তাই শামসুন নেহারের এই বিদায় শুধু একটি কর্মজীবনের সমাপ্তি নয়, বরং ৩৬ বছরের ভালোবাসা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার এক অনন্য স্বীকৃতি।





















