তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কেরামতনগরে অবস্থিত মো. কেরামত আলী জামে মসজিদ। মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি এলাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপত্য নিদর্শন। ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও দানশীল ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী মসজিদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই মসজিদটির নামকরণ করা হয়।

মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ এবং এর দুই পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট দুটি গম্বুজ রয়েছে। এছাড়া মসজিদের চার কোণায় রয়েছে চারটি লম্বাকৃতির সুউচ্চ মিনার। একসময় মূল্যবান ইরানি পাথর দিয়ে নির্মিত গম্বুজগুলোর কারুকাজ থাকলেও কালের পরিক্রমায় তার কিছু অংশ হারিয়ে গেছে। তবে মসজিদের ভেতর ও বাইরের অধিকাংশ নকশা, কারুকাজ, মোজাইক ও মার্বেল পাথরের সৌন্দর্য এখনো দৃশ্যমান।
মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বসবাসের জন্য রয়েছে মনোরম আবাসিক কোয়ার্টার। পাশাপাশি রয়েছে বড় পুকুর, পুকুরঘাট ও অজুখানা। মসজিদটিতে একসঙ্গে সহস্রাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মুসল্লি এখানে সমবেত হন। অনেক দর্শনার্থীও মসজিদটির নান্দনিক স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী দেখতে ছুটে আসেন।
দানশীল ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব কেরামত আলীর বর্ণাঢ্য জীবন
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী শুধু একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসেবক। তাঁর জন্ম ১৯০১ সালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ পরগনার বাদেসোনাপুর গ্রামে। ১৯৬৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের শুরুর দিকে ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত তিনি পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশের চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় যুক্ত হন। বাঁশ, কাঠ ও পাটের ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি কেরামত ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন, কোল্ড স্টোরেজ এবং একাধিক চা-বাগান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।
শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ভানুগাছের শফাত আলী মাদ্রাসা তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া কেরামতনগর ডাকঘর, স্থানীয় মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি আর্থিক সহযোগিতা করেন।
তৎকালীন সময়ে মৌলভীবাজার কলেজ প্রতিষ্ঠায় ৭৫ হাজার টাকা এবং শ্রীমঙ্গল কলেজ প্রতিষ্ঠায় ২৫ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সিলেটের পুরাতন মেডিকেল কলেজের দেয়াল নির্মাণ এবং ভানুগাছ রেলস্টেশন স্থাপনেও তাঁর অবদানের কথা জানা যায়।
রাজনীতিতে কেরামত আলীর ভূমিকা
রাজনৈতিক জীবনেও আলহাজ্ব কেরামত আলীর ছিল উল্লেখযোগ্য পরিচিতি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি রাজনগরের অ্যাডভোকেট জসীম উদ্দিনের সঙ্গে মিলে ‘কিষাণ লীগ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ওই নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগ প্রার্থীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
পরবর্তীতে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির হয়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হন এবং পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালে তাঁর ছেলে মুহিবুর রহমান কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে আলহাজ্ব কেরামত আলী পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন।
এছাড়া তৎকালীন মহকুমা লোকাল বোর্ডের সদস্য ও সহসভাপতি হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তরও তাঁদের হাতেই স্থাপিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহ্যের স্মারক কেরামত আলী মসজিদ
কমলগঞ্জের কেরামত আলী জামে মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী ও একজন দানশীল ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন। মুঘল স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত এর গম্বুজ, মিনার ও নান্দনিক কারুকাজ মসজিদটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।
ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মসজিদটি স্থানীয় দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয়। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এলাকার গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করতে পারে।
তথ্যসূত্র: ১. মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য — রব্বানী চৌধুরী।
২. মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস — মোহাম্মদ মুমিনুল হক।





















