সাহারুল হক সাচ্চু . উল্লাপাড়া ( সিরাজগঞ্জ ):
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় আমন ধানে কৃষক নানা স্বপ্ন বুনছে। কোনো কোনো মাঠে আমন ধানে পাক ধরেছে। আবার কোনো কোনো মাঠে সবে ছড়া বেরুচ্ছে। আর বেশিরভাগ মাঠে ধানের কাইচ থোড়। গ্রামের গৃহস্থ কৃষক মাঠের আমন ধান ফসল নানা পরিকল্পনা নিয়ে আছেন। এক ফসলের লাভের টাকায় কৃষক আরেক ফসলের আবাদে খরচ করবেন। এমন কৃষক এক – দুজন নয় সংখ্যায় শত শত জন। আর এক গ্রামের নয় যে গ্রামের মাঠে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে সে গ্রামের কৃষকেরা স্বপ্ন আর পরিকল্পনা নিয়ে আছেন।
উল্লাপাড়া উপজেলায় এবারের মৌসুমে ১১ হাজার ৫৫০ হেক্টর পরিমাণ জমিতে রোপা আমন ধান আবাদের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিলো। সেখানে ১১ হাজার ৭৬০ হেক্টরে রোপা আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর বেশি পরিমাণ জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লাপাড়ায় এবারে স্বাভাবিক বন্যা হয়নি। স্বাভাবিক বন্যা হলে পানিতে তলিয়ে যায় এমন বেশিরভাগ মাঠে বন্যার পানি হয়নি।এসব মাঠে কৃষকেরা ধুমসে রোপা আমনের আবাদ করেছেন।
উপজেলার উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নের বাখুয়া, নাগরৌহা, ভদ্রকোল, পংরৌহা, চালা, পারতেতুলিয়া, পূর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের পুকুরপাড়, ছয়বারিয়া, পুঠিয়া, মধুপুর, ঘিয়ালা, গোয়ালজানি, গয়হাট্রা, বাঙ্গালা ইউনিয়নের ভয়নগর, ধামাইলকান্দি, খোজাখালি, রহিমপুর, মালিপাড়া, আফার, মোড়দহ, সলঙ্গা ইউনিয়নের আঙ্গারু, শহরিয়ারপুর, চরবেড়া, তেলকুপি, বনবারিয়া, গোজা,রাণীনগর,জগজীবনপুর,আলমের দহ, বড়হর ইউনিয়নের পাগলা, বোয়ালিয়া,গুয়াগাতি, মৈত্র বড়হর ও আরো বিভিন্ন মাঠে কৃষকেরা রোপা আমনের আবাদ করেছেন। এছাড়া উপজেলার রামকৃষ্ণপুর, দুর্গানগর, হাটিকুমরুল, পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে কৃষকেরা রোপা আমনের আবাদ করেছেন। কৃষকেরা কাটারীভোগ, গুটি স্বর্ণা, ব্রি ধান ৭৫, ব্রি ধান ৮৭, ব্রি ধান ১০৩, ব্রি ধান ৪৮, ব্রি ধান ৯০ ও আরো বেশি হারে ফলনশীল নানা জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে। সব মাঠেই কৃষকেরা সেচ মেশিনে পানি সেচ দিয়ে রোপা আমনের আবাদ করছেন। বেশিরভাগ অগভীর নলকূপ সেচ মেশিন মালিক ও কৃষকেরা ফসলের ভাগের চুক্তিতে এর আবাদ করছেন। কৃষকদের কথায় জমিতে পানি সেচ বাবদ ফসলের সিকি নয়তো পাচ ভাগের এক ভাগ সেচ মেশিন মালিকদের দেওয়ার চুক্তিতে তারা রোপা আমনের আবাদ করছেন। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকার মাঠে ঘুরে দেখা গেছে কোনো কোনো মাঠে দু-চার দশ বিঘা জমিতে আগে লাগানো ধানে পাক ধরেছে। একই মাঠে বেশিরভাগ জমির ধানের ছড়া বেরুচ্ছে। কোনো কোনো মাঠের ধান কাইচ থোড়। আর ভরা মৌসুমে ( আগাম ও নাবির মধ্য সময়কাল) লাগানো চারা থেকে গুছিতে ধান গাছ বেড়ে উঠছে। এসব জমির আগাছা ঘাস নিড়ানি ও সার এখন আর দেওয়া লাগবে না বলে জানানো হয়। এখন কৃষকেরা দরকার হলে মধ্য দুপুরে কীটনাশক ঔষধ স্প্রে করছেন। কৃষকেরা বলছেন এবারে স্বাভাবিক বন্যা না হওয়ায় জমি পতিত না রেখে অনেকেই রোপা আমনের আবাদ করেছেন। উল্লাপাড়া থেকে গয়হাট্রা সড়কে, মোহনপুর সড়কে, ধরইল সড়কে, হরিণচড়া সড়কে, ধামাইলকান্দি থেকে গোজা সড়কে, বোয়ালিয়া থেকে মানিকদিয়ার সড়কে, সলঙ্গা থেকে বনবারিয়া সড়কে চলাচলে চোখে পড়ে শুধু রোপা আমনের সবুজ আর সবুজ ধান জমি। এখন সব মাঠেরই ধান ভালো দেখা যাচ্ছে।
সলঙ্গা ইউনিয়নের চরবেড়া ও গোজা মাঠে ঘুরে দেখা গেছে বেশিরভাগ জমির ধানের ছড়া বেরিয়েছে। কোনো কোনো জমির ধানে পাক ধরেছে। চরবেড়া মাঠে কৃষক আঃ রশিদ মোল্লা নিজের অগভীর শ্যালো মেশিনের স্ক্রীমে বিঘা দশেক জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিজের তিন বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ করেছেন। এক বিঘা জমিতে কাটারীভোগ ও ব্রি ধান ৩৯ দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন। নিজের বীজতলার চারা জমিতে লাগিয়েছেন। কাটারীভোগ ধানে পাক ধরেছে। দিন সাতেক পর কাটা যাবে বলে জানান। তিনি বলেন পানি সেচ বাবদ ফসলের পাচ ভাগের এক ভাগ সেচ মেশিন মালিক পাবেন। তিনি আশা করছেন বিঘায় ১৮ থেকে ২০ মণ হারে ফলন মিলবে। রোপা আমন ধান কেটে সে জমিতে সরিষা ফসলের আবাদ করবেন। একই মাঠে চান মিয়া নিজের সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কাটারীভোগ , গুটি স্বর্ণার আবাদ করেছেন। তার কাটারীভোগ সপ্তাহ দেড়েক পর কাটা যাবে বলে আশা করছেন। তার সেচ মেশিনের আওতায় প্রায় দশ বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়েছে। উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নের নাগরৌহা গ্রামের মাঠে প্রায় আড়াইশো বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। নাগরৌহা গ্রামের কৃষক আঃ করিম এবারে ১৬ বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ করেছেন। তিনি ব্রি ধান ৩৯ ও হাইব্রিড জাতের ধানের আবাদ করেছেন। নাগরৌহা মাঠে কাটারীভোগ , ব্রি ধান ৩৯, ব্রি ধান ১০৩, হাইব্রিড জাতের ধানের আবাদ কৃষকেরা করেছেন। সরেজমিনে মাঠে ঘুরে দেখা ও জানা গেছে প্রায় বারো আনা জমির ধান এখন কাইচ থোড়। নাগরৌহা গ্রামের কৃষক আঃ কাদের, আরিফ, রফিকুল ইসলাম, সুলতানুল ইসলাম, হায়দার আলী বেশি হারে ফলনশীল নানা জাতের রোপা আমন ধানের আবাদ করেছেন। কৃষকেরা আলাপকালে বলেন এবারে সব মাঠেই ধান ভালো দেখা যাচ্ছে। কৃষকেরা আরো বলেন রোপা আমন ধান বেচে সংসারের দরকারে খরচ এবং সামনের সরিষা ও বোরো ধান ফসলের আবাদে খরচ করবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমী বলেন কৃষি প্রণোদনায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ হাজার ২০০ জনকে বিনামূল্যে আমন ধান বীজ ও রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে। এবারের মৌসুমে সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর বেশি পরিমাণ জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। কৃষকেরা বেশি হারে ফলন মেলে এমন সব জাতের ধানের আবাদ করেছেন।


























