নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
সম্প্রতি নেত্রকোনা সীমান্তে দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে অনুসন্ধানী সাহসী সাংবাদিক আলিফকে।এ অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যা কান্ড কোনমতেই মানতে পারছেন না বিবেকবান নেত্রকোনা জেলা ও বিভিন্ন জেলার সাংবাদিক সমাজ। বিভিন্ন জেলায় তাই এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মিছিল, প্রতিবাদ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
একদিকে বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার সীমান্ত দুর্গাপুর,কলমাকান্দা সীমান্ত অপরদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য অবস্থিত। আলিফ এ সীমান্তবর্তী চোরাচালান, সন্ত্রাস, দুর্নীতির জীবন্ত চিত্র তুলে ধরতেন তার ছবি ও ভিডিওচিত্রের বলিষ্ঠ ভাষায়। হয়তোবা এজন্য তিনি সীমান্তের দুর্বৃত্ত ও চোরাচালানীদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন নিজের জান্তে কিংবা অজান্তে।
সত্য সন্ধানী সংবাদের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি একেক সময় একেক ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। এভাবেই তিনি সময়ের চক্রে হয়ে উঠেছিলেন এক অনুসন্ধানী সাংবাদিক।কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো চায়ের দোকানি, কখনো জুতা সেলাইকারী মুচি। কখনো বা পাগলের বেশে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।নেশা ছিল মাদক, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের কারবার ও বালু-পাথরের ব্যবসার নানা তথ্য সংগ্রহ করা।
ধীরে ধীরে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্তের সন্ত্রাস চোরাচালানের বিরুদ্ধে সংবাদের তথ্য সরবরাহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি আলিফ। অন্যদিকে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজেও বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করতেন নিয়মিত।
স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী, স্বজনরা জানান, অতীতে কয়েক বার রিপোর্ট লেখা ও তথ্য সরবরাহের জন্য আলিফকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচেনি। ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশেই প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা দুর্বৃত্তরা। প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে সীমান্তবর্তী এলাকাসহ সারা জেলা।
চাঞ্চল্যকর এ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের তদন্তে সামনে ওঠে এসেছে সীমান্ত এলাকার অপরাধজগতের দুই পরিচিত ব্যক্তি শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ এবং তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-এর নাম। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অপেক্ষা আলিফকে কে বা কারা হত্যা করেছে।আর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কিরকম শাস্তি হবে,তা জানার জন্য।
পুলিশ জানিয়েছে, সাংবাদিক আলিফ হত্যার ঘটনায় শুটার হিসেবে তাজুলের নাম এসেছে। শামীমকেও সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। তাঁদের দুজনের দুই আত্মীয়কে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। চলছে সীমান্তবর্তী এলাকায় জোর তদন্ত ও অভিযান।
সীমান্তের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে শামীম ও তাজুল দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের কারবার এবং বালু-পাথরের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
এদিকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত শুটার শামীমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে ৩০টির মতো এবং তাজুলের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা অতীতে দায়ের করা হয়েছে। আর তাজুলের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অধিকাংশই হত্যাসংক্রান্ত বলে জানিয়েছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ।
উল্লেখিতশামীম আহমেদ দুর্গাপুর উপজেলার কাকড়াকান্দা এলাকার আবদুস ছাত্তারের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকেষ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, ডাকাতি ও সীমান্তে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
২০১২ সালে একটি অস্ত্র মামলায় আদালত তাজুলকে ১০ বছর সাত মাসের কারাদণ্ড দেন। এরপর তিনি পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে কলমাকান্দা উপজেলা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে তখনকার র্যাব (বর্তমান এসআরবি)। তবে ওই সময় তাঁকে শুধু নতুন অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল এবং আগের মামলা ও সাজার তথ্য গোপন করা হয়েছিল,এমন অভিযোগ ওঠে।
জেলা সাংবাদিক, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি গজনবী বিপ্লব বলেন, তাজুলকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর আগের মামলা ও সাজার তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে আলিফ পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন আলিফ।
আলিফের স্বজন ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর তখনকার পুলিশ সুপার ফয়েজ আহম্মেদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। পরে ধর্ষণসহ দুটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন আলিফ।দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান সাংবাদিক আলিফ। জামিন পেয়ে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
নিহত আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের অভিমত, গত বছর অন্তত দুইবার আলিফকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর শহরে আলিফের মতো দেখতে পুলিশের এসআই শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন আলিফ। হামলাকারীরা তাকে ভেবে ভুল করে শফিকুলকে হত্যা করেছিল বলে ধারণা করা হয়।
পুনরায় গত বছরের নভেম্বরে দুর্গাপুর শহরে রামদা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আলিফের ওপর হামলা চালানো হয়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। সেবারও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।এসব ঘটনার পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে নিজের নিরাপত্তাঝুঁকির কথা তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিক আলিফ।
আলিফের কর্মস্থল রূপসী বাংলার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আলিফ সীমান্ত এলাকার মাদক, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথরের ব্যবসা, অস্ত্রের কারবার ও চাঁদাবাজির তথ্য সংগ্রহ করতেন। অনেক সময় ছদ্মবেশে এসব তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। আমাকে তিনি প্রায়ই বলতেন।
এ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, অপরাধের তথ্য প্রকাশের কারণে আলিফের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অপরাধী চক্রগুলো। একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার পরও তিনি কাজ বন্ধ করেননি। আলিফ পুলিশের কাছে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়েও পাননি। তাঁকে হত্যার জন্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বসে আছে, পুলিশ সুপারকে বিষয়টি জানানোর পরও কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
আলিফ হত্যার পরদিন তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৮ অক্টোবর কিলার তাজুলের ভাতিজা সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়।পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় অপূর্ব ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর হেফাজতে অস্ত্রভর্তি একটি ব্যাগ ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে গত ২০ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর থেকে আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি শুটার শামীমের ভাগ্নে। ২১ অক্টোবর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাও জানান, অপরাধ অনুসন্ধানের কাজ করতে গিয়ে তাঁর স্বামী সন্ত্রাসীদের শত্রুতে পরিণত হয়। কয়েক বার শত্রুর হামলার শিকার হওয়ার পরও তিনি সত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে গেছেন। নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জানতে চাইলে দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, গ্রেপ্তার দুজনের একজন শুটার শামীমের ভাগনে এবং অন্যজন কিলার তাজুলের ভাতিজা। মূল শুটারদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। শুটার শামীমের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০টি এবং তাজুলের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, আলিফ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের কাছাকাছি রয়েছে পুলিশ। শুটার হিসেবে তাজুলের নাম এসেছে। শামীমকেও সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, কাউকে ছাড় নয়।আগের ঘটনাসহ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে দিনরাত কাজ করছে পুলিশ।
আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নেত্রকোনা জেলা শহর ও কলমাকান্দায় মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী, স্বজন ও সাংবাদিকেরা। মানববন্ধনে আলিফের মা জোবেদা আক্তার, বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ফকির ও সাদেক ফকির, বোন কল্পনা আক্তার ও মিলা, স্থানীয় নাজমুল হাসান, স্কুলশিক্ষক ও সাবেক ইউপি সদস্য সঞ্চয় নন্দীসহ এলাকাবাসী ছিলেন।
মা জোবেদা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে জীবন দিয়েছে।সে কোন দিন অন্যায় করেনি।আমার নিষ্পাপ ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’
নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়ায় জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আরেকটি মানববন্ধন হয়। রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি হায়দার জাহান চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান, সাংবাদিক এরশাদুল হক জনিসহ সাংবাদিকেরা অংশগ্রহণ করেন।




















