টেলিফোন বুথ – আমীরুল আরহাম

টেলিফোন বুথ – আমীরুল আরহাম

অফিস থেকে বেরিয়ে সারিবদ্ধ তিওলের পথে পা-বাড়াতেই, রাস্তার বাঁ-দিকে মৃতদেহ-বাহক একটা কালো গাড়ি দেখে থেমে গেলাম। এই পথে গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ। কেউ মারা গেছেন বুঝলাম কিন্তু কে মারা গেলেন, জিজ্ঞাস্য চোখে চারিদিকে চোখ ফেলেও কাউকে দেখতে পেলাম না।

এমনিতেই এই শহরে হাল্কা বসতি, তদুপরি পাঁচ মিনিট হাঁটলেই মার্ণ নদীর পাড় ঘেঁষে বিশাল নোয়াজিয়েল পার্ক। শরতের পড়ন্তবিকেলের এই সময়টিতে তিওল ফুলের মৌ মৌ গন্ধে মৌমাছির গুঞ্জন শোনার জন্যে এখানে কেউ বসে থাকে না। যারা যাবার তারা গেছে পার্কে কালপোশাকধারী পেশাদার চারজন বাহক গাড়িটিতে একটা কফিন তুললো।  মাথায় টুপি, তসবি হাতে দুই আলজেরিয়ান ভদ্রলোক এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে রইলেন পাশেই। গাড়িটি খুব ধিমালয়ে আমার সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছে, দেখলাম, তিওলের হলুদ পাতা ঝরে পড়ছে গাড়ির উপর। রাস্তায় তিওলফুলের মধুমেখে গাড়ির চাকা ক’টি যখন চিটপিট শব্দ নিয়ে ডান পাশের রাস্তার নেমে গেলো, পিছনে পিছনে হেঁটে আসা আলজেরিয়ান ভদ্রলোকদুটির সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম কফিনবাসী ভদ্রলোক আমার পরিচিত কারাবিয়ান দ্বীপের গোয়াদলুপের সেই ভদ্রলোক, যাকে আমি দীর্ঘদিন টেলিফোন বুথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। প্রতিদিনকার জীবনে কতো কিছুর সাথেই আমাদের নিত্য পরিচিতি, কটিই বা তার আমাদের গ্রাহ্যে আসে, কিন্তু সেদিনের সেই স্মৃতি আজ আমায় তাড়িয়ে এলো।

মাথার উপর ওঁর কোন ছায়া আছে কিনা আমার জানা ছিলনা, কিন্তু তিওলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। অফিসে যাবার পথে রাস্তা পেরুতেই ওঁর পাশ কাটিয়ে আমার নৈমিত্তিক যাতায়াত। মুখ বরাবর রাস্তার ওপাশে টেলিফোন বুথটার দিকে একনিমেশে তাকিয়ে প্রতিদিন ওঁর ঐ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার বিশেষ ভঙ্গি দেখে আমার মনে হলো যে ওঁর মনে কেউ নিশ্চয়ই ছায়া ফেলেছে।

পৈষট্টি-সত্তর বয়স হবে। চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। পরনে প্যান্ট। গায়ে ভারি কোর্ট।মাথায় হ্যালি হ্যান্সনের উলেন ক্যাপ। গলায় উলের ফুলেল মাফলার। সে সময়ের কার্ড সিস্টেমের টেলিফোন বুথের দিকে একভাবে তাকিয়ে পিছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। মাঝেমধ্যে বুথের মধ্যেও দেখতাম। বুথের মধ্যে তিনি যাত্রা মঞ্চের অমলেন্দু বিশ্বাস, নাট্যমঞ্চের উৎপল দত্ত, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত কিংবা আলি যাকেরের কথা মনে করিয়ে দিতেন। টেলিফোন বুথগুলোর বাইরে থেকে শব্দ শোনার কোন উপায় নেই। তাঁর আলাপের বিষয় কিংবা সংলাপও আমার অজানা এবং অশ্রুত। কিন্তু ওঁর মুখাভঙ্গি আর হাতপা ছোঁড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে আমার আন্দাজ করতে অসুবিধা হত না যে প্রিয়জনের সাথে ওঁর আলাপটি কখন সা-তে আর কখন সাত মাত্রায়। আমার অফিসে যাবার তখন তাড়া থাকতো না। বুথের আরেক পাশে খালি বেঞ্চে বসে হাতে বই নিয়ে ওঁকে চোখবিদ্ধ করে ঠোঁটের ভাষা পড়তাম। সে সময়ে আমার একটা ছবির সাউন্ড সিঙ্ক্রোনাইজেশনের কাজ চলছিল। ওঁর ঠোঁট মিলিয়ে শব্দ বাক্য পড়ার লোভটা সেকারণে দিনদিন বেড়েই চলছিল। ওঁকে বুথের মধ্যে দেখলেই আমি বই হাতে বেঞ্চে। আমিও ভাবতাম আমাকে কেউ আবার চোখবন্দী করছে কিনা।

চৌরাস্তার এই কোণটিতে বেঞ্চ আর বুথের দূরত্বের মধ্যে এভাবেই দুজনের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে তিনিও হয়তো আমাকে ভেবে নিয়েছিলেন বেঞ্চেবসা কাছের মানুষ। প্যারিসের অদূরে নোয়াজিয়েল শহরের এই নির্জন এলাকায় ঘণ্টায় যখন ১০/২০টা মানুষ হেঁটে চলে, তখন প্রায় বই হাতে নিকট বেঞ্চে বসা থাকা লোখটিকে কাছের মানুষই তো ভাবার কথা।

কাছাকাছি হলে ‘বঁজু’ও (শুভসকাল) বিনিময় হয়েছে। ঐ পর্যন্তই। সাউন্ড সিঙ্ক্রোনাইজেশনের ভাষা শিক্ষাটা সার্থক হচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক অথবা ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কোন তাড়া ছিল না আমার। কিন্তু সেদিন সকাল বেলায় ওঁর ভীষণ হাত-পা দাপিয়ে চিৎকার বুথের দরজা ভেঙে বেরিয়ে এলো,না! তুই ওর কাছে আর যাবি না। বল, আর যাবি না ?” প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে একই সংলাপের বারংবার উচ্চারণে ওঁর বারণ করার গুরুত্বটা আরো বেড়ে গেলো, যখন দেখলাম এক পর্যায়ে পকেটে রাখা টিসু পেপার নিয়ে কালো ফ্রেমের চশমাটির ভিতর দিয়ে উনি চোখ মুছছেন। আহা! সত্যিই তো, এত করেই যখন বলছেন, তার কাছে না-গেলেই হয়। কিন্তু মুখের কথায় বারণ মানার যে-কোন কারণ নেই, জীবনের এই পর্যায়ে এসেও তিনি হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি। সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু সেদিন বুথের বাইরে একজনকে অপেক্ষা করতে দেখে তিনি রিসিভার রেখে বেরিয়ে তাঁর ঠিক নির্দিষ্ট জায়গাটিতে নিজস্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি বই বন্ধ করে ইচ্ছে করেই সেদিন ওঁর পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে  ‘বঁজু’ দিলাম। উনি হয়তো শুনতে পাননি। কোন উত্তর করলেন না। ওঁর সামনে-পিছনে দুপাশের তিওলের মাঝখানে সারিবদ্ধ ড্যাফোডিলস সোজা নোয়াজিয়েলের আর-ই-আর (প্যারিসকে ভেদ করে যে ট্রেনটি ইল দ্য ফ্রান্স বা বৃহত্তর প্যারিস পর্যন্ত যাতায়াত করে) ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে। সেদিকেই একটা বিষণ্ণ উদাস চোখ মেলে ওঁকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, “কেন যাবি তুই ? আমি তোরে ভালবাসি। কিন্তু তুই আমারে ভালবাসিস না।“ – টিস্যু পেপারটা ওঁর হাতের মুঠোয় খুব যত্ন করে ধরা। কেউ না থাকুক, টিস্যু পেপারটা তার।

বছরের প্রথম দিকের এক রবিবার। একই জায়গায় তিনি দাঁড়িয়ে। ওঁর ভারি কোর্টের জায়গায় হাল্কা রঙিন একটা কোর্ট সেদিন। কোর্টের পকেট থেকে একটা রঙিন রুমাল উঁকি দিচ্ছে। পরনে হলুদ প্যান্ট। মাথায় ক্যারাবিয়ান ফেদোরা টুপি। পায়ে চকচকে ইটালিয়ান পার্টি স্যু। নিজ দেশ গোয়াদলুপে কার্নিভাল উৎসব। উৎসবে যোগ দেবার জন্যেই আজ যেন তিনি সেজেছেন। টেলিফোন বুথ থেকে একজন ফোন করে বেরুনো মাত্রই তিনি ঢুকে গেলেন। ডায়াল করছেন কিন্তু কোন উত্তর নেই। আবার ডায়াল করলেন। ধরে আছেন কানে। কোন কথা নেই। ডায়াল কেটে আবারো ডায়াল করলেন। কোন উত্তর নেই। রিসিভার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। আবার ডায়াল করলেন কিন্তু কোন সংলাপ নেই। রিসিভারটা জোরে ছুঁড়ে দিলেন। টেলিফোন থেকে তারের মাথায় রিসিভারটি কয়েকটি দোলন দিয়ে যখন থেমে গেলো, সেটি জায়গা মতো রেখে, ফেদোরো টুপিটা হাতে তিনি বেরিয়ে এলেন। আমি ওঁকে এই পর্যন্ত দেখে অফিসে গেলাম। প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে ঘরে ফেরার পথে ওঁকে ঠিক আগেরমতোই টেলিফোন বুথের মধ্যে দেখলাম। একইভাবে ডায়াল করছেন, রিসিভারটা কানে ধরে « হ্যালো হ্যালো হ্যালো” করে রেখে দিয়ে বুথের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আজকের বিশেষ এইদিনে ওঁর প্রেমিকার কোন সংবাদ নেই। তবে  কি তাঁর যুবক প্রেমিকের সাথে কার্নিভালে আজ সে নাচবে ? মনে পড়ে গেলো মারসেল ক্যামুর ‘ওরফে নেগ্রো’র ছবির কথা। উরিদিস ও ওরফের সেই অসাধারণ প্রেম কাহিনী। আহা কি সেই প্রেম আর অসাধারণ মিউজিক! ঈর্ষার প্রতীকী এক ভয়ঙ্কর মাস্কের কারণে উরিদিসের মৃত্যু এবং ওরফের হাহাকার এক চিরন্তন ট্রাজেডি হয়ে আছে। কিন্তু কি কাহিনী ওঁদের, কোন অদৃষ্ট বাঁধনে এই বয়সে তিনি তিওলের প্রলম্বিত ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, এই সব ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরলাম।

বিজ্ঞাপন

বাইরে ছিলাম। অফিসে আসিনি কিছুদিন। সেদিন সোমবার সকালে অফিসে আসার পথে ওঁকে টেলিফোন বুথের মধ্যে দেখলাম। ঠিক সেভাবেই ডায়াল করছেন। আবার কিছুক্ষণ রিসিভারটা কানে দিয়ে হ্যালো হ্যালো করলেন। এরপরে রিসিভারটা রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরেই বুথের টেলিফোনে ক্রিং ক্রিং ক্রিং…। বাজপাখির শিকারের মতো তার হাত রিসিভার ধরলো। লক্ষ্য করলাম যে টেলিফোনের দরজাটি ভেঙ্গে যাওয়াতে ওঁর কণ্ঠ আজ রাস্তায় নেমেছে।

“এতক্ষণ কোথায় ছিলি, সেঞ্চি ? ওহ ! কোন সৈকতে গিয়েছিলি ? কি ? আবারও সেন্ট লুইতে গিয়েছিস ? মুহূর্তের তীব্র উদ্বিগ্নতা ওঁর চোখেমুখে। তোরে না বলেছি, ঐ সৈকতে তুই যাবি না ? আমার প্রাণটাকে বুলডগ হাঙ্গরে খেয়ে নিলে আমি কি নিয়ে বাঁচব রে ? তুই ওখানে আর যাবি না। আচ্ছা, কথা দিচ্ছিস তো ?  হাঁ, হাঁ, ‘সাঁন্তানে’ যাবি, নতুবা ক্যারাভ্যাল লাগনে যাবি। ওখানে মাথা ডুবিয়ে সাঁতার কাটলেই আমার সাথে তোর দেখা হবে। হাঁ সত্যি বলছি, ওখানে তুই আমাকে দেখতে পাবি। শোন সোনা, আমি প্রথমে উড়ন্ত মাছ হয়ে সমুদ্রে নামবো। এরপরে হাম্বাক তিমির রূপ নিয়ে তোর কাছে ছুটে আসব। তোকে অনেক আদর করব। সার্জন মাছ তোর কাছে যেই আসবে, ভাববি রঙিন কোর্ট পরে সে-আমিই। স্ন্যাপারতো আমার পেট আর ব্যাটমাছকে তো আমার কান দুটো দিয়েই দিয়েছি। আস্তে ধরিস কিন্তু সোনা।“  ওঁর মুখে এই প্রথম হো হো অট্টহাসিতে তিওলের কিছু পাতা ঝরে পড়লো।

নড়তে পারছিলাম না। আমিও যেন ওঁদের দুটিকে দেখার জন্যে ল্য গ্র্যান্ড কুল দ্য স্যাক মাঁরার লাগনের  বড় পাথরটির উপরে বসে নীলজলে পা ডুবিয়ে বসে আছি। আলাপটা গড়িয়ে গেলো শনির রাতের ক্লাবে। « ক্লাব থেকে ঘরে ফিরেছিলি ? তো ফোন ধরলি না কেন ?” সত্যি বলছিস ? » অতঃপর অনেকক্ষণ নিস্তব্দতা।
“আমার প্রিয়প্রাণ শোন, সারারাত তোকে নিয়ে ঘুমায়। ঘুম তো হয়না, ঘুমের ভানে জেগে থাকি। সবসময় ভাবি, কবে আমার হৃদয়টাকে বুকের মধ্যে পাব।“ – টিস্যু পেপারটিকে চোখের জলে ভিজিয়ে নিলেন এই মুহূর্তে।
« কবে আসবি তুই ? আর কতদিন অপেক্ষা করতে বলবি?
হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো” – বলতে বলতে একসময়ে রিসিভার রেখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।

আরেকদিন, ঝিমঝিম বৃষ্টির সকাল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ১২/১৩ ডিগ্রীর তাপমাত্রায় উলেন একটা  ওভারকোর্ট পরে তিনি বুথের মধ্যে কথা বলছেন।
“তো আবার টাকা চাইছিস কেন ? গত সপ্তায় তো পাঠালাম ? কি করিস এতো টাকা ? পেনশনের সব টাকা তোরে দিলে আমি খাবো কি ? ও আচ্ছা। কিন্তু তোর জন্মদিন তো এখনো এক মাস সাত দিন বাঁকি ? কি করবি জন্মদিনে ? কি ? তালের সালাদ, সোমচা, ঝালে-পিঁয়াজে বিসিক, পাতে ক্রেওল, গলদা চিংড়ি ? তোর বন্ধু আসবে নিশ্চয়ই ?” – শুনতে শুনতে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম।

কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে খেয়াল রাখিনি ওঁর দিকে। সেদিন সোমবার। রোদেলা সকাল। তিনি যথারীতি রিসিভার হাতে টেলিফোন বুথটির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠিক এমনি সময়ে মিউনিসিপ্যালিটির বিশেষ একটা ক্যাট লিফট ট্রাক সামনে এগিয়ে এলো। ট্র্যাক্টটি ক্রমশই টেলিফোন বুথের কাছে এগিয়ে এসে ওঁকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলো। উনি বেরিয়ে এলেন। পিছন থেকে একজন মুহূর্তেই কেটে দিলো তারটি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ টেলিফোন বুথটিকে ট্রাকের উপরে হাল্কা করে তুলে নিলো ওরা। টেলিফোন বুথটি প্রমোশন পেয়ে ট্রাকের উপরে অটুট দাঁড়িয়ে রইলো। কল্পচোখে আমি বুথের মধ্যে ওঁকে নির্বাক ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। ট্রাকটি নিশ্চিন্তমনে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, দেখলাম তিনি হা-করে সেদিকে উদাস তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রাকটি দৃষ্টি সীমানার বাইরে গেলে ঘাড় ফিরিয়ে তিনি পিছনে সারিবদ্ধ তিওলের পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন।
এই পথের শেষ মাথায় তিনতলা একটা বিল্ডিং « Maison de retraites »  অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্তদের জন্যে বাসস্থান।

জনপ্রিয়
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ

টেলিফোন বুথ – আমীরুল আরহাম

আপডেট সময় : ০১:৪৪:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

অফিস থেকে বেরিয়ে সারিবদ্ধ তিওলের পথে পা-বাড়াতেই, রাস্তার বাঁ-দিকে মৃতদেহ-বাহক একটা কালো গাড়ি দেখে থেমে গেলাম। এই পথে গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ। কেউ মারা গেছেন বুঝলাম কিন্তু কে মারা গেলেন, জিজ্ঞাস্য চোখে চারিদিকে চোখ ফেলেও কাউকে দেখতে পেলাম না।

এমনিতেই এই শহরে হাল্কা বসতি, তদুপরি পাঁচ মিনিট হাঁটলেই মার্ণ নদীর পাড় ঘেঁষে বিশাল নোয়াজিয়েল পার্ক। শরতের পড়ন্তবিকেলের এই সময়টিতে তিওল ফুলের মৌ মৌ গন্ধে মৌমাছির গুঞ্জন শোনার জন্যে এখানে কেউ বসে থাকে না। যারা যাবার তারা গেছে পার্কে কালপোশাকধারী পেশাদার চারজন বাহক গাড়িটিতে একটা কফিন তুললো।  মাথায় টুপি, তসবি হাতে দুই আলজেরিয়ান ভদ্রলোক এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে রইলেন পাশেই। গাড়িটি খুব ধিমালয়ে আমার সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছে, দেখলাম, তিওলের হলুদ পাতা ঝরে পড়ছে গাড়ির উপর। রাস্তায় তিওলফুলের মধুমেখে গাড়ির চাকা ক’টি যখন চিটপিট শব্দ নিয়ে ডান পাশের রাস্তার নেমে গেলো, পিছনে পিছনে হেঁটে আসা আলজেরিয়ান ভদ্রলোকদুটির সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম কফিনবাসী ভদ্রলোক আমার পরিচিত কারাবিয়ান দ্বীপের গোয়াদলুপের সেই ভদ্রলোক, যাকে আমি দীর্ঘদিন টেলিফোন বুথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। প্রতিদিনকার জীবনে কতো কিছুর সাথেই আমাদের নিত্য পরিচিতি, কটিই বা তার আমাদের গ্রাহ্যে আসে, কিন্তু সেদিনের সেই স্মৃতি আজ আমায় তাড়িয়ে এলো।

মাথার উপর ওঁর কোন ছায়া আছে কিনা আমার জানা ছিলনা, কিন্তু তিওলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। অফিসে যাবার পথে রাস্তা পেরুতেই ওঁর পাশ কাটিয়ে আমার নৈমিত্তিক যাতায়াত। মুখ বরাবর রাস্তার ওপাশে টেলিফোন বুথটার দিকে একনিমেশে তাকিয়ে প্রতিদিন ওঁর ঐ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার বিশেষ ভঙ্গি দেখে আমার মনে হলো যে ওঁর মনে কেউ নিশ্চয়ই ছায়া ফেলেছে।

পৈষট্টি-সত্তর বয়স হবে। চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। পরনে প্যান্ট। গায়ে ভারি কোর্ট।মাথায় হ্যালি হ্যান্সনের উলেন ক্যাপ। গলায় উলের ফুলেল মাফলার। সে সময়ের কার্ড সিস্টেমের টেলিফোন বুথের দিকে একভাবে তাকিয়ে পিছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। মাঝেমধ্যে বুথের মধ্যেও দেখতাম। বুথের মধ্যে তিনি যাত্রা মঞ্চের অমলেন্দু বিশ্বাস, নাট্যমঞ্চের উৎপল দত্ত, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত কিংবা আলি যাকেরের কথা মনে করিয়ে দিতেন। টেলিফোন বুথগুলোর বাইরে থেকে শব্দ শোনার কোন উপায় নেই। তাঁর আলাপের বিষয় কিংবা সংলাপও আমার অজানা এবং অশ্রুত। কিন্তু ওঁর মুখাভঙ্গি আর হাতপা ছোঁড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে আমার আন্দাজ করতে অসুবিধা হত না যে প্রিয়জনের সাথে ওঁর আলাপটি কখন সা-তে আর কখন সাত মাত্রায়। আমার অফিসে যাবার তখন তাড়া থাকতো না। বুথের আরেক পাশে খালি বেঞ্চে বসে হাতে বই নিয়ে ওঁকে চোখবিদ্ধ করে ঠোঁটের ভাষা পড়তাম। সে সময়ে আমার একটা ছবির সাউন্ড সিঙ্ক্রোনাইজেশনের কাজ চলছিল। ওঁর ঠোঁট মিলিয়ে শব্দ বাক্য পড়ার লোভটা সেকারণে দিনদিন বেড়েই চলছিল। ওঁকে বুথের মধ্যে দেখলেই আমি বই হাতে বেঞ্চে। আমিও ভাবতাম আমাকে কেউ আবার চোখবন্দী করছে কিনা।

চৌরাস্তার এই কোণটিতে বেঞ্চ আর বুথের দূরত্বের মধ্যে এভাবেই দুজনের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে তিনিও হয়তো আমাকে ভেবে নিয়েছিলেন বেঞ্চেবসা কাছের মানুষ। প্যারিসের অদূরে নোয়াজিয়েল শহরের এই নির্জন এলাকায় ঘণ্টায় যখন ১০/২০টা মানুষ হেঁটে চলে, তখন প্রায় বই হাতে নিকট বেঞ্চে বসা থাকা লোখটিকে কাছের মানুষই তো ভাবার কথা।

কাছাকাছি হলে ‘বঁজু’ও (শুভসকাল) বিনিময় হয়েছে। ঐ পর্যন্তই। সাউন্ড সিঙ্ক্রোনাইজেশনের ভাষা শিক্ষাটা সার্থক হচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক অথবা ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কোন তাড়া ছিল না আমার। কিন্তু সেদিন সকাল বেলায় ওঁর ভীষণ হাত-পা দাপিয়ে চিৎকার বুথের দরজা ভেঙে বেরিয়ে এলো,না! তুই ওর কাছে আর যাবি না। বল, আর যাবি না ?” প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে একই সংলাপের বারংবার উচ্চারণে ওঁর বারণ করার গুরুত্বটা আরো বেড়ে গেলো, যখন দেখলাম এক পর্যায়ে পকেটে রাখা টিসু পেপার নিয়ে কালো ফ্রেমের চশমাটির ভিতর দিয়ে উনি চোখ মুছছেন। আহা! সত্যিই তো, এত করেই যখন বলছেন, তার কাছে না-গেলেই হয়। কিন্তু মুখের কথায় বারণ মানার যে-কোন কারণ নেই, জীবনের এই পর্যায়ে এসেও তিনি হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি। সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু সেদিন বুথের বাইরে একজনকে অপেক্ষা করতে দেখে তিনি রিসিভার রেখে বেরিয়ে তাঁর ঠিক নির্দিষ্ট জায়গাটিতে নিজস্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি বই বন্ধ করে ইচ্ছে করেই সেদিন ওঁর পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে  ‘বঁজু’ দিলাম। উনি হয়তো শুনতে পাননি। কোন উত্তর করলেন না। ওঁর সামনে-পিছনে দুপাশের তিওলের মাঝখানে সারিবদ্ধ ড্যাফোডিলস সোজা নোয়াজিয়েলের আর-ই-আর (প্যারিসকে ভেদ করে যে ট্রেনটি ইল দ্য ফ্রান্স বা বৃহত্তর প্যারিস পর্যন্ত যাতায়াত করে) ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে। সেদিকেই একটা বিষণ্ণ উদাস চোখ মেলে ওঁকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, “কেন যাবি তুই ? আমি তোরে ভালবাসি। কিন্তু তুই আমারে ভালবাসিস না।“ – টিস্যু পেপারটা ওঁর হাতের মুঠোয় খুব যত্ন করে ধরা। কেউ না থাকুক, টিস্যু পেপারটা তার।

বছরের প্রথম দিকের এক রবিবার। একই জায়গায় তিনি দাঁড়িয়ে। ওঁর ভারি কোর্টের জায়গায় হাল্কা রঙিন একটা কোর্ট সেদিন। কোর্টের পকেট থেকে একটা রঙিন রুমাল উঁকি দিচ্ছে। পরনে হলুদ প্যান্ট। মাথায় ক্যারাবিয়ান ফেদোরা টুপি। পায়ে চকচকে ইটালিয়ান পার্টি স্যু। নিজ দেশ গোয়াদলুপে কার্নিভাল উৎসব। উৎসবে যোগ দেবার জন্যেই আজ যেন তিনি সেজেছেন। টেলিফোন বুথ থেকে একজন ফোন করে বেরুনো মাত্রই তিনি ঢুকে গেলেন। ডায়াল করছেন কিন্তু কোন উত্তর নেই। আবার ডায়াল করলেন। ধরে আছেন কানে। কোন কথা নেই। ডায়াল কেটে আবারো ডায়াল করলেন। কোন উত্তর নেই। রিসিভার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। আবার ডায়াল করলেন কিন্তু কোন সংলাপ নেই। রিসিভারটা জোরে ছুঁড়ে দিলেন। টেলিফোন থেকে তারের মাথায় রিসিভারটি কয়েকটি দোলন দিয়ে যখন থেমে গেলো, সেটি জায়গা মতো রেখে, ফেদোরো টুপিটা হাতে তিনি বেরিয়ে এলেন। আমি ওঁকে এই পর্যন্ত দেখে অফিসে গেলাম। প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে ঘরে ফেরার পথে ওঁকে ঠিক আগেরমতোই টেলিফোন বুথের মধ্যে দেখলাম। একইভাবে ডায়াল করছেন, রিসিভারটা কানে ধরে « হ্যালো হ্যালো হ্যালো” করে রেখে দিয়ে বুথের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আজকের বিশেষ এইদিনে ওঁর প্রেমিকার কোন সংবাদ নেই। তবে  কি তাঁর যুবক প্রেমিকের সাথে কার্নিভালে আজ সে নাচবে ? মনে পড়ে গেলো মারসেল ক্যামুর ‘ওরফে নেগ্রো’র ছবির কথা। উরিদিস ও ওরফের সেই অসাধারণ প্রেম কাহিনী। আহা কি সেই প্রেম আর অসাধারণ মিউজিক! ঈর্ষার প্রতীকী এক ভয়ঙ্কর মাস্কের কারণে উরিদিসের মৃত্যু এবং ওরফের হাহাকার এক চিরন্তন ট্রাজেডি হয়ে আছে। কিন্তু কি কাহিনী ওঁদের, কোন অদৃষ্ট বাঁধনে এই বয়সে তিনি তিওলের প্রলম্বিত ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, এই সব ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরলাম।

বিজ্ঞাপন

বাইরে ছিলাম। অফিসে আসিনি কিছুদিন। সেদিন সোমবার সকালে অফিসে আসার পথে ওঁকে টেলিফোন বুথের মধ্যে দেখলাম। ঠিক সেভাবেই ডায়াল করছেন। আবার কিছুক্ষণ রিসিভারটা কানে দিয়ে হ্যালো হ্যালো করলেন। এরপরে রিসিভারটা রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরেই বুথের টেলিফোনে ক্রিং ক্রিং ক্রিং…। বাজপাখির শিকারের মতো তার হাত রিসিভার ধরলো। লক্ষ্য করলাম যে টেলিফোনের দরজাটি ভেঙ্গে যাওয়াতে ওঁর কণ্ঠ আজ রাস্তায় নেমেছে।

“এতক্ষণ কোথায় ছিলি, সেঞ্চি ? ওহ ! কোন সৈকতে গিয়েছিলি ? কি ? আবারও সেন্ট লুইতে গিয়েছিস ? মুহূর্তের তীব্র উদ্বিগ্নতা ওঁর চোখেমুখে। তোরে না বলেছি, ঐ সৈকতে তুই যাবি না ? আমার প্রাণটাকে বুলডগ হাঙ্গরে খেয়ে নিলে আমি কি নিয়ে বাঁচব রে ? তুই ওখানে আর যাবি না। আচ্ছা, কথা দিচ্ছিস তো ?  হাঁ, হাঁ, ‘সাঁন্তানে’ যাবি, নতুবা ক্যারাভ্যাল লাগনে যাবি। ওখানে মাথা ডুবিয়ে সাঁতার কাটলেই আমার সাথে তোর দেখা হবে। হাঁ সত্যি বলছি, ওখানে তুই আমাকে দেখতে পাবি। শোন সোনা, আমি প্রথমে উড়ন্ত মাছ হয়ে সমুদ্রে নামবো। এরপরে হাম্বাক তিমির রূপ নিয়ে তোর কাছে ছুটে আসব। তোকে অনেক আদর করব। সার্জন মাছ তোর কাছে যেই আসবে, ভাববি রঙিন কোর্ট পরে সে-আমিই। স্ন্যাপারতো আমার পেট আর ব্যাটমাছকে তো আমার কান দুটো দিয়েই দিয়েছি। আস্তে ধরিস কিন্তু সোনা।“  ওঁর মুখে এই প্রথম হো হো অট্টহাসিতে তিওলের কিছু পাতা ঝরে পড়লো।

নড়তে পারছিলাম না। আমিও যেন ওঁদের দুটিকে দেখার জন্যে ল্য গ্র্যান্ড কুল দ্য স্যাক মাঁরার লাগনের  বড় পাথরটির উপরে বসে নীলজলে পা ডুবিয়ে বসে আছি। আলাপটা গড়িয়ে গেলো শনির রাতের ক্লাবে। « ক্লাব থেকে ঘরে ফিরেছিলি ? তো ফোন ধরলি না কেন ?” সত্যি বলছিস ? » অতঃপর অনেকক্ষণ নিস্তব্দতা।
“আমার প্রিয়প্রাণ শোন, সারারাত তোকে নিয়ে ঘুমায়। ঘুম তো হয়না, ঘুমের ভানে জেগে থাকি। সবসময় ভাবি, কবে আমার হৃদয়টাকে বুকের মধ্যে পাব।“ – টিস্যু পেপারটিকে চোখের জলে ভিজিয়ে নিলেন এই মুহূর্তে।
« কবে আসবি তুই ? আর কতদিন অপেক্ষা করতে বলবি?
হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো” – বলতে বলতে একসময়ে রিসিভার রেখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।

আরেকদিন, ঝিমঝিম বৃষ্টির সকাল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ১২/১৩ ডিগ্রীর তাপমাত্রায় উলেন একটা  ওভারকোর্ট পরে তিনি বুথের মধ্যে কথা বলছেন।
“তো আবার টাকা চাইছিস কেন ? গত সপ্তায় তো পাঠালাম ? কি করিস এতো টাকা ? পেনশনের সব টাকা তোরে দিলে আমি খাবো কি ? ও আচ্ছা। কিন্তু তোর জন্মদিন তো এখনো এক মাস সাত দিন বাঁকি ? কি করবি জন্মদিনে ? কি ? তালের সালাদ, সোমচা, ঝালে-পিঁয়াজে বিসিক, পাতে ক্রেওল, গলদা চিংড়ি ? তোর বন্ধু আসবে নিশ্চয়ই ?” – শুনতে শুনতে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম।

কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে খেয়াল রাখিনি ওঁর দিকে। সেদিন সোমবার। রোদেলা সকাল। তিনি যথারীতি রিসিভার হাতে টেলিফোন বুথটির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠিক এমনি সময়ে মিউনিসিপ্যালিটির বিশেষ একটা ক্যাট লিফট ট্রাক সামনে এগিয়ে এলো। ট্র্যাক্টটি ক্রমশই টেলিফোন বুথের কাছে এগিয়ে এসে ওঁকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলো। উনি বেরিয়ে এলেন। পিছন থেকে একজন মুহূর্তেই কেটে দিলো তারটি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ টেলিফোন বুথটিকে ট্রাকের উপরে হাল্কা করে তুলে নিলো ওরা। টেলিফোন বুথটি প্রমোশন পেয়ে ট্রাকের উপরে অটুট দাঁড়িয়ে রইলো। কল্পচোখে আমি বুথের মধ্যে ওঁকে নির্বাক ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। ট্রাকটি নিশ্চিন্তমনে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, দেখলাম তিনি হা-করে সেদিকে উদাস তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রাকটি দৃষ্টি সীমানার বাইরে গেলে ঘাড় ফিরিয়ে তিনি পিছনে সারিবদ্ধ তিওলের পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন।
এই পথের শেষ মাথায় তিনতলা একটা বিল্ডিং « Maison de retraites »  অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্তদের জন্যে বাসস্থান।