এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়:
একসময় কোলের সন্তানকে আগলে রাখতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয়েছিল জাতীয় দলের জার্সি। কিন্তু দমে যাননি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার অদম্য নারী ইসমেতারা নিশি। দীর্ঘ ছয় বছরের মাতৃত্বকালীন বিরতি আর ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই শেষে তিনি কেবল মাঠেই ফেরেননি, এবার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী হ্যান্ডবল দলকে।
আগামী ১৮ থেকে ২২ অক্টোবর ঢাকার ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বেগম খালেদা জিয়া আইএইচএফ নেশনস ট্রফি আন্তর্জাতিক নারী হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা’। এই আসরে স্বাগতিক বাংলাদেশের অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের মাগুড়া গ্রামের ইসমাইল হোসেনের মেয়ে নিশি।
স্কুলের মাঠ থেকে জাতীয় দলের নেতৃত্বে নিশির হ্যান্ডবল জীবনের হাতেখড়ি তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের মাঠে। প্রতিষ্ঠানটির শরীরচর্চা
শিক্ষক আবুল হোসেনের জাদুকরী নির্দেশনায় খেলার প্রতি অনুরাগী হন তিনি। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাঁকে নিয়ে এসেছে আজকের অবস্থানে। নিশি বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহিলা ব্যাটালিয়নের একজন সিপাহী হিসেবে কর্মরত।
মাতৃত্বের বিরতি ও রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আসরে খেলার সুযোগ এলেও তখন তাঁর সন্তান ছোট থাকায় তিনি দলে থাকতে পারেননি। একজন মায়ের জন্য ক্যারিয়ার আর সন্তানের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সেই কঠিন মুহূর্ত পেরিয়ে নিশি আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নিশির এই পথচলায় স্বামী বিপ্লব হোসেনের অকৃত্রিম সমর্থন এবং একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজের প্রতি মমতা তাঁর প্রধান শক্তি হয়ে কাজ করেছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রত্যাবর্তন নিশির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি এক বিশাল গৌরবের।
লক্ষ্য এখন ফাইনাল আসন্ন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপ। স্প্যানিশ কোচ ‘আনা আলোনসো ফ্রাগুয়া’র অধীনে গত তিন মাস নিবিড় অনুশীলনে
ঘাম ঝরিয়েছে বাংলাদেশ দল। অধিনায়ক নিশি বলেন, “এবারই প্রথম আমরা কোনো বিদেশি কোচের অধীনে আধুনিক কৌশল শেখার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের দল এখন বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। ভারতের সাথে ফাইনাল খেলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কোর্টে নিজেদের সেরাটা দিয়ে আমরা দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে চাই।”
প্রান্তিক প্রতিভা বিকাশে আধুনিক প্রশিক্ষণের দাবি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নিশি মনে করেন, জেলা পর্যায় থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান মেয়েদের শুরু থেকেই আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। তিনি বলেন, “আমরা সবাই মূলত গ্রামীণ স্কুল থেকে উঠে আসি। শুরু থেকেই যদি দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পে বিদেশি কোচের অধীনে অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা যায়, তবে মেয়েরা দ্রুত উন্নতি করবে এবং ভবিষ্যতে দেশকে বড় সাফল্য এনে দিতে পারবে।”
তেঁতুলিয়ার গর্ব ও আগামীর প্রেরণা হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়ের প্রান্তিক এক গ্রাম থেকে উঠে এসে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া নিশি আজ পুরো জেলার অহংকার। তাঁর এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের মেয়েদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে যে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো প্রতিকূলতাই বাধা হতে পারে না।
এখন ১৮ অক্টোবরের অপেক্ষায় ক্রীড়াপ্রেমীরা। নিশির নেতৃত্বে বাংলাদেশ নারী হ্যান্ডবল দল যেন আন্তর্জাতিক এই আসরে লাল-সবুজের বিজয় কেতন ওড়াতে পারে এমন স্বপ্ন সবার|





















