ফ্রান্স থেকে ইতালি, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সামাজিক অসন্তোষ, নেপথ্যে কী?

ফ্রান্স থেকে ইতালি, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সামাজিক অসন্তোষ, নেপথ্যে কী?

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ, পর্তুগালে আবাসনসংকট, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, দেশভেদে আন্দোলনের দাবি ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার উদ্বেগ, সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান পাওয়া, কর্মসংস্থান ও আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবার মান—এসব প্রশ্ন ঘিরেই বাড়ছে অসন্তোষ।

তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এই বিক্ষোভকে একক কোনো আন্দোলন কিংবা অভ্যুত্থান হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং জাতীয় পর্যায়ের পৃথক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ফ্রান্স: জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদ

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকসংক্রান্ত সমস্যা এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ। বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবিগুলো রাজপথের আন্দোলনে উঠে এসেছে।

রয়টার্সের ২৪ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সেদিন দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। প্যারিসে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন করা হয়েছিল ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য।

অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ এক বিষয়, আর বিক্ষোভের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতা আরেক বিষয়। সব বিক্ষোভকারীকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি সহিংসতার ঘটনাগুলো উপেক্ষা করাও বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।

পর্তুগাল: আবাসনসংকটে বাড়ছে ক্ষোভ

পর্তুগালে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের আবাসনসংকটকে আরও তীব্র করেছে। বিশেষ করে লিসবন ও পোর্তোর মতো বড় শহরে সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়াদের অধিকার ও আবাসননীতির পরিবর্তনের দাবিতে প্রতিবাদ জোরালো হয়েছে।

রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিসবন ও পোর্তোর জনসমাগমস্থল থেকে প্রতিবাদকারীদের তাঁবু সরিয়ে দেওয়ার পরও আন্দোলনকারীরা ফিরে এসে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশি অভিযানে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বড় শহরগুলোতে আবাসনের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

ভাড়াবাজার সংস্কারে সরকারের প্রস্তাবও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ সহজ করা এবং নতুন ভাড়ার চুক্তিতে ভাড়ার সীমা তুলে দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে বাড়িওয়ালারা আরও বেশি বাসস্থান ভাড়ার বাজারে আনতে উৎসাহিত হতে পারেন। তবে ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এর ফলে ভাড়া আরও বাড়তে পারে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসননিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ফলে পর্তুগালের বিক্ষোভ শুধু বাড়ির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবাসননীতি, ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা এবং বড় শহরে বসবাসের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রশ্ন।

স্পেন: বাড়িভাড়া, উচ্ছেদ ও পেনশন নিয়ে উদ্বেগ

স্পেনেও আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান, ভাড়াটিয়াদের অধিকার এবং উচ্ছেদ ঠেকানোর দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছে। একই সঙ্গে পেনশনব্যবস্থা ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।

রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মাদ্রিদের ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িটির ভাড়া আগে মাসে ৫৭০ ইউরো থাকলেও নতুন মালিকের অধীনে যাওয়ার পর তা বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ ইউরোতে দাঁড়ায়। ঘটনাটি স্পেনে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা ও উচ্ছেদসংক্রান্ত বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে, ২৪ অক্টোবর মাদ্রিদে পেনশনব্যবস্থা ও অবসরকালীন অধিকার রক্ষার দাবিতে সমাবেশের খবর প্রকাশিত হয়। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পেনশনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে সরকারি পেনশনব্যবস্থা কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

স্পেনের পরিস্থিতি তাই শুধু আবাসনসংকটে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মজীবী মানুষ, ভাড়াটিয়া ও পেনশনভোগীদের পৃথক দাবি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।

ইতালি: মজুরি, জ্বালানি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ

ইতালিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মজুরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।

কিছু এলাকায় কৃষকেরা জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসনের মতো বিষয় নিয়ে দাবি তুলেছেন।

এখানে আন্দোলনের দাবিগুলোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কৃষকদের প্রধান উদ্বেগ উৎপাদন ব্যয় ও আয় নিয়ে, অন্যদিকে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে মজুরি, কর্মসংস্থান এবং সরকারি পরিষেবা। এসব প্রতিবাদ বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের অংশ হলেও প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে নিজস্ব বাস্তবতা।

বেলজিয়াম: সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাত নিয়ে প্রতিবাদ

বিজ্ঞাপন

বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয়সংকোচন, শিক্ষা খাত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ অক্টোবর ব্রাসেলসে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির বিরুদ্ধে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ১৭ অক্টোবরও শহরটিতে প্রতিবাদের খবর প্রকাশিত হয়।

সরকারি ব্যয় কমানোর নীতি, শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন কর্মসূচিতে উঠে এসেছে। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, ব্যয়সংকোচনের সিদ্ধান্ত সরকারি পরিষেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে বেলজিয়ামের সব বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোনো কর্মসূচিতে সরকারি নীতির বিরোধিতা, কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতের সমস্যা, আবার কোথাও সামাজিক অধিকার রক্ষার দাবি প্রাধান্য পেয়েছে। তাই দেশটির আন্দোলনকে কেবল মূল্যস্ফীতি বা জ্বালানির দামের প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বাদ পড়ে যাবে।

ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও কি একই প্রবণতা?

ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি ও বেলজিয়ামের বাইরে গ্রিস ও আলবেনিয়াতেও সাম্প্রতিক প্রতিবাদের খবর এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তরুণদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি নীতি নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।

গ্রিসে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও আবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগ আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান নিয়ে দাবিও যুক্ত হয়েছে।

তবে এসব দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কোথাও আবাসনসংকট আন্দোলনের প্রধান কারণ, কোথাও সরকারি নীতি বা দুর্নীতির অভিযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ইউরোপের সব প্রতিবাদকে একই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে দেশভিত্তিক কারণগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অসন্তোষের অভিন্ন কারণ কী?

বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসে—জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান, আবাসনের উচ্চ খরচ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ।

রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের এক বিশ্লেষণে জ্বালানি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট বাজারের অস্থিরতাকে ইউরোপের অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুরো পরিস্থিতিকে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আবাসনসংকট, মজুরি, শিক্ষা এবং সরকারি পরিষেবার সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন কারণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেই আগে বেড়ে যাওয়া পণ্যের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ, দাম বাড়ার গতি কমলেও পণ্য ও পরিষেবার মূল্য উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে। একই সময়ে আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকে।

আবাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়লে কর্মজীবী মানুষ এবং তরুণদের জন্য স্বাধীনভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় ঘাটতি দেখা দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

তবে এসব কারণের গুরুত্ব সব দেশে সমান নয়। নির্দিষ্ট কোনো দেশের পরিস্থিতি বুঝতে হলে সেখানকার মজুরি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় এবং সরকারি নীতির তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ইউরোপজুড়ে কি একক অভ্যুত্থান চলছে?

সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলোকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—ইউরোপজুড়ে কি কোনো সমন্বিত আন্দোলন বা অভ্যুত্থান চলছে?

এখন পর্যন্ত আলোচিত প্রতিবেদনগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে কিংবা এগুলো একটি অভিন্ন অভ্যুত্থানের অংশ।

বিক্ষোভের সময় কাছাকাছি হওয়া এবং দাবির মধ্যে কিছু মিল থাকা নিজে থেকেই সমন্বিত নেতৃত্ব বা যৌথ পরিকল্পনার প্রমাণ নয়। বিভিন্ন দেশের মানুষ একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারেন, কিন্তু সেই চাপের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

ফ্রান্সে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়, পর্তুগালে আবাসননীতি, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাতের প্রশ্ন আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের প্রতিবাদকারীদের উৎসাহিত করতে পারে কিংবা প্রতিবাদের কৌশল ও বক্তব্যে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এমন সম্ভাবনা এবং প্রমাণিত সমন্বিত আন্দোলন এক বিষয় নয়। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এ দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

সামনে কী হতে পারে?

ইউরোপের এই সামাজিক অসন্তোষ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো কীভাবে মানুষের দাবির জবাব দেয় তার ওপর।

আবাসনসংকট মোকাবিলা, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এবং জ্বালানির ব্যয় সামলানোর মতো বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অসন্তোষের কিছু কারণ প্রশমিত হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের ফল নির্ভর করবে নীতির ধরন, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর।

একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং ভাঙচুর, লুটপাট বা মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ মানুষের দাবি জানানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; আবার জননিরাপত্তা রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে একক কোনো অভ্যুত্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখার চেয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বাসস্থান, আয় এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, তার উত্তর নির্ভর করবে রাজপথের দাবির জবাবে সরকারগুলো বাস্তবে কী পরিবর্তন আনে এবং সেই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে তার ওপর।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
ফের সহিংসতা প্যারিসে, বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স

ফের সহিংসতা প্যারিসে, বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স

ফ্রান্স থেকে ইতালি, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সামাজিক অসন্তোষ, নেপথ্যে কী?

আপডেট সময় : ১১:৫৭:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ, পর্তুগালে আবাসনসংকট, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, দেশভেদে আন্দোলনের দাবি ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার উদ্বেগ, সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান পাওয়া, কর্মসংস্থান ও আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবার মান—এসব প্রশ্ন ঘিরেই বাড়ছে অসন্তোষ।

তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এই বিক্ষোভকে একক কোনো আন্দোলন কিংবা অভ্যুত্থান হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং জাতীয় পর্যায়ের পৃথক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ফ্রান্স: জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদ

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকসংক্রান্ত সমস্যা এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ। বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবিগুলো রাজপথের আন্দোলনে উঠে এসেছে।

রয়টার্সের ২৪ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সেদিন দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। প্যারিসে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন করা হয়েছিল ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য।

অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ এক বিষয়, আর বিক্ষোভের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতা আরেক বিষয়। সব বিক্ষোভকারীকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি সহিংসতার ঘটনাগুলো উপেক্ষা করাও বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।

পর্তুগাল: আবাসনসংকটে বাড়ছে ক্ষোভ

পর্তুগালে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের আবাসনসংকটকে আরও তীব্র করেছে। বিশেষ করে লিসবন ও পোর্তোর মতো বড় শহরে সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়াদের অধিকার ও আবাসননীতির পরিবর্তনের দাবিতে প্রতিবাদ জোরালো হয়েছে।

রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিসবন ও পোর্তোর জনসমাগমস্থল থেকে প্রতিবাদকারীদের তাঁবু সরিয়ে দেওয়ার পরও আন্দোলনকারীরা ফিরে এসে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশি অভিযানে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বড় শহরগুলোতে আবাসনের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

ভাড়াবাজার সংস্কারে সরকারের প্রস্তাবও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ সহজ করা এবং নতুন ভাড়ার চুক্তিতে ভাড়ার সীমা তুলে দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে বাড়িওয়ালারা আরও বেশি বাসস্থান ভাড়ার বাজারে আনতে উৎসাহিত হতে পারেন। তবে ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এর ফলে ভাড়া আরও বাড়তে পারে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসননিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ফলে পর্তুগালের বিক্ষোভ শুধু বাড়ির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবাসননীতি, ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা এবং বড় শহরে বসবাসের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রশ্ন।

স্পেন: বাড়িভাড়া, উচ্ছেদ ও পেনশন নিয়ে উদ্বেগ

স্পেনেও আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান, ভাড়াটিয়াদের অধিকার এবং উচ্ছেদ ঠেকানোর দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছে। একই সঙ্গে পেনশনব্যবস্থা ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।

রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মাদ্রিদের ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িটির ভাড়া আগে মাসে ৫৭০ ইউরো থাকলেও নতুন মালিকের অধীনে যাওয়ার পর তা বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ ইউরোতে দাঁড়ায়। ঘটনাটি স্পেনে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা ও উচ্ছেদসংক্রান্ত বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে, ২৪ অক্টোবর মাদ্রিদে পেনশনব্যবস্থা ও অবসরকালীন অধিকার রক্ষার দাবিতে সমাবেশের খবর প্রকাশিত হয়। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পেনশনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে সরকারি পেনশনব্যবস্থা কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

স্পেনের পরিস্থিতি তাই শুধু আবাসনসংকটে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মজীবী মানুষ, ভাড়াটিয়া ও পেনশনভোগীদের পৃথক দাবি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।

ইতালি: মজুরি, জ্বালানি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ

ইতালিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মজুরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।

কিছু এলাকায় কৃষকেরা জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসনের মতো বিষয় নিয়ে দাবি তুলেছেন।

এখানে আন্দোলনের দাবিগুলোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কৃষকদের প্রধান উদ্বেগ উৎপাদন ব্যয় ও আয় নিয়ে, অন্যদিকে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে মজুরি, কর্মসংস্থান এবং সরকারি পরিষেবা। এসব প্রতিবাদ বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের অংশ হলেও প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে নিজস্ব বাস্তবতা।

বেলজিয়াম: সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাত নিয়ে প্রতিবাদ

বিজ্ঞাপন

বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয়সংকোচন, শিক্ষা খাত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ অক্টোবর ব্রাসেলসে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির বিরুদ্ধে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ১৭ অক্টোবরও শহরটিতে প্রতিবাদের খবর প্রকাশিত হয়।

সরকারি ব্যয় কমানোর নীতি, শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন কর্মসূচিতে উঠে এসেছে। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, ব্যয়সংকোচনের সিদ্ধান্ত সরকারি পরিষেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে বেলজিয়ামের সব বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোনো কর্মসূচিতে সরকারি নীতির বিরোধিতা, কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতের সমস্যা, আবার কোথাও সামাজিক অধিকার রক্ষার দাবি প্রাধান্য পেয়েছে। তাই দেশটির আন্দোলনকে কেবল মূল্যস্ফীতি বা জ্বালানির দামের প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বাদ পড়ে যাবে।

ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও কি একই প্রবণতা?

ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি ও বেলজিয়ামের বাইরে গ্রিস ও আলবেনিয়াতেও সাম্প্রতিক প্রতিবাদের খবর এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তরুণদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি নীতি নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।

গ্রিসে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও আবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগ আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান নিয়ে দাবিও যুক্ত হয়েছে।

তবে এসব দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কোথাও আবাসনসংকট আন্দোলনের প্রধান কারণ, কোথাও সরকারি নীতি বা দুর্নীতির অভিযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ইউরোপের সব প্রতিবাদকে একই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে দেশভিত্তিক কারণগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অসন্তোষের অভিন্ন কারণ কী?

বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসে—জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান, আবাসনের উচ্চ খরচ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ।

রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের এক বিশ্লেষণে জ্বালানি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট বাজারের অস্থিরতাকে ইউরোপের অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুরো পরিস্থিতিকে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আবাসনসংকট, মজুরি, শিক্ষা এবং সরকারি পরিষেবার সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন কারণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেই আগে বেড়ে যাওয়া পণ্যের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ, দাম বাড়ার গতি কমলেও পণ্য ও পরিষেবার মূল্য উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে। একই সময়ে আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকে।

আবাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়লে কর্মজীবী মানুষ এবং তরুণদের জন্য স্বাধীনভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় ঘাটতি দেখা দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

তবে এসব কারণের গুরুত্ব সব দেশে সমান নয়। নির্দিষ্ট কোনো দেশের পরিস্থিতি বুঝতে হলে সেখানকার মজুরি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় এবং সরকারি নীতির তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ইউরোপজুড়ে কি একক অভ্যুত্থান চলছে?

সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলোকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—ইউরোপজুড়ে কি কোনো সমন্বিত আন্দোলন বা অভ্যুত্থান চলছে?

এখন পর্যন্ত আলোচিত প্রতিবেদনগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে কিংবা এগুলো একটি অভিন্ন অভ্যুত্থানের অংশ।

বিক্ষোভের সময় কাছাকাছি হওয়া এবং দাবির মধ্যে কিছু মিল থাকা নিজে থেকেই সমন্বিত নেতৃত্ব বা যৌথ পরিকল্পনার প্রমাণ নয়। বিভিন্ন দেশের মানুষ একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারেন, কিন্তু সেই চাপের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

ফ্রান্সে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়, পর্তুগালে আবাসননীতি, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাতের প্রশ্ন আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের প্রতিবাদকারীদের উৎসাহিত করতে পারে কিংবা প্রতিবাদের কৌশল ও বক্তব্যে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এমন সম্ভাবনা এবং প্রমাণিত সমন্বিত আন্দোলন এক বিষয় নয়। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এ দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

সামনে কী হতে পারে?

ইউরোপের এই সামাজিক অসন্তোষ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো কীভাবে মানুষের দাবির জবাব দেয় তার ওপর।

আবাসনসংকট মোকাবিলা, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এবং জ্বালানির ব্যয় সামলানোর মতো বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অসন্তোষের কিছু কারণ প্রশমিত হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের ফল নির্ভর করবে নীতির ধরন, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর।

একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং ভাঙচুর, লুটপাট বা মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ মানুষের দাবি জানানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; আবার জননিরাপত্তা রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে একক কোনো অভ্যুত্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখার চেয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বাসস্থান, আয় এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, তার উত্তর নির্ভর করবে রাজপথের দাবির জবাবে সরকারগুলো বাস্তবে কী পরিবর্তন আনে এবং সেই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে তার ওপর।