ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ,প্রতিকার এবং আক্রান্ত হলে করণীয়

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ,প্রতিকার এবং আক্রান্ত হলে করণীয়

ডেঙ্গু জ্বর আসলে কী?

​ডেঙ্গু হলো ফ্লাভিভাইরাস (Flavivirus) পরিবারের একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং কিছু ক্ষেত্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Aedes albopictus) মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এবং দিনের বেলা (বিশেষ করে ভোরবেলা এবং বিকালে) কামড়ায়।

ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণসমূহ –

​মশা কামড়ানোর সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

​তীব্র জ্বর: হঠাৎ করে শরীরের তাপমাত্রা ১০২° থেকে ১০৫° ফারেনহাইটে উঠে যাওয়া।

​তীব্র মাথা ব্যথা: কপালে ও চোখের পেছনে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হওয়া।

​গায়ে ও জয়েন্টে ব্যথা: পেশিতে, হাড়ে এবং জয়েন্টগুলোতে তীব্র ব্যথার কারণে একে অনেক সময় “হাড় ভাঙা জ্বর” (Break-bone fever) বলা হয়।

​ত্বকে র‍্যাশ বা লালচে দাগ: জ্বর আসার ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শরীরে ছোট ছোট লালচে র‍্যাশ বা ঘামাচির মতো দেখা দিতে পারে।

​বমি ভাব ও বমি: খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া এবং বারবার বমি হওয়া।

​ক্লান্তি: অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা ও অবসাদগ্রস্ততা।

​রক্তপাত (ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ): নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, ত্বকে কালচে বা নীলচে দাগ হওয়া এবং মলের সাথে রক্ত যাওয়া।

ডেঙ্গু হলে প্রাথমিক করণীয় ও চিকিৎসা-

​ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিত। সাধারণ ডেঙ্গু ঘরে বসেই চিকিৎসা করা সম্ভব।

​পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ: শরীরে পানির ঘাটতি রোধ করতে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের জুস এবং স্যুপ খেতে হবে।

​প্যারাসিটামল সেবন: জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে (ওজন ও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে)।

​পূর্ণ বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে।

​জরুরি সতর্কতা:
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে ভুলেও অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) কিংবা কোনো ধরনের নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ (NSAID) খাওয়া যাবে না। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

কখন হাসপাতালে যাবেন? (বিপদচিহ্নসমূহ)

​ডেঙ্গুর একটি বিশেষ পর্যায়কে “ক্রিটিক্যাল ফেজ” বলা হয় (সাধারণত জ্বর কমার সময় ৩য় থেকে ৫ম দিনে)। এই সময়ে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে অবিলম্বে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে:

​পেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা অবিরাম বমি হওয়া।

​শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে (যেমন: নাক, মাড়ি) রক্তপাত হওয়া।

​রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া।

​অতিরিক্ত দুর্বলতা বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রলাপ বকা।

​শ্বাসের কষ্ট হওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।

​২৪ ঘণ্টায় প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কমে যাওয়া বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।

ডেঙ্গু প্রতিকার ও প্রতিরোধ :

​যেহেতু ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট বা শতভাগ কার্যকর একক ওষুধ নেই, তাই মশার বংশবিস্তার রোধ করাই সবচেয়ে বড় প্রতিকার।

​পানি জমতে না দেওয়া: বাড়ির আশপাশে বা টবে, ফুলের টব, এসির পানি, ছাদ বা বারান্দার পাত্রে যেন ৩ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

​মশার কামড় থেকে রক্ষা: দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন। শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক (ফুল হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট) পরিধান করুন।

​মশা তাড়ানোর ক্রিম: প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ক্রিম (Mosquito repellent cream) ব্যবহার করতে পারেন।

​পরিবেশ পরিষ্কার রাখা: বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখুন এবং নিয়মিত স্প্রে বা ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশা নিধনের ব্যবস্থা করুন।

লেখক: ডা. মো. নাফিজুর আলম

জনপ্রিয়
প্রেসক্লাব যশোরের নবনির্বাচিত কমিটিকে তালা প্রেসক্লাবের শুভেচ্ছা

প্রেসক্লাব যশোরের নবনির্বাচিত কমিটিকে তালা প্রেসক্লাবের শুভেচ্ছা

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ,প্রতিকার এবং আক্রান্ত হলে করণীয়

আপডেট সময় : ০৩:৪৮:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গু জ্বর আসলে কী?

​ডেঙ্গু হলো ফ্লাভিভাইরাস (Flavivirus) পরিবারের একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং কিছু ক্ষেত্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Aedes albopictus) মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এবং দিনের বেলা (বিশেষ করে ভোরবেলা এবং বিকালে) কামড়ায়।

ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণসমূহ –

​মশা কামড়ানোর সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

​তীব্র জ্বর: হঠাৎ করে শরীরের তাপমাত্রা ১০২° থেকে ১০৫° ফারেনহাইটে উঠে যাওয়া।

​তীব্র মাথা ব্যথা: কপালে ও চোখের পেছনে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হওয়া।

​গায়ে ও জয়েন্টে ব্যথা: পেশিতে, হাড়ে এবং জয়েন্টগুলোতে তীব্র ব্যথার কারণে একে অনেক সময় “হাড় ভাঙা জ্বর” (Break-bone fever) বলা হয়।

​ত্বকে র‍্যাশ বা লালচে দাগ: জ্বর আসার ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শরীরে ছোট ছোট লালচে র‍্যাশ বা ঘামাচির মতো দেখা দিতে পারে।

​বমি ভাব ও বমি: খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া এবং বারবার বমি হওয়া।

​ক্লান্তি: অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা ও অবসাদগ্রস্ততা।

​রক্তপাত (ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ): নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, ত্বকে কালচে বা নীলচে দাগ হওয়া এবং মলের সাথে রক্ত যাওয়া।

ডেঙ্গু হলে প্রাথমিক করণীয় ও চিকিৎসা-

​ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিত। সাধারণ ডেঙ্গু ঘরে বসেই চিকিৎসা করা সম্ভব।

​পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ: শরীরে পানির ঘাটতি রোধ করতে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের জুস এবং স্যুপ খেতে হবে।

​প্যারাসিটামল সেবন: জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে (ওজন ও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে)।

​পূর্ণ বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে।

​জরুরি সতর্কতা:
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে ভুলেও অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) কিংবা কোনো ধরনের নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ (NSAID) খাওয়া যাবে না। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

কখন হাসপাতালে যাবেন? (বিপদচিহ্নসমূহ)

​ডেঙ্গুর একটি বিশেষ পর্যায়কে “ক্রিটিক্যাল ফেজ” বলা হয় (সাধারণত জ্বর কমার সময় ৩য় থেকে ৫ম দিনে)। এই সময়ে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে অবিলম্বে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে:

​পেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা অবিরাম বমি হওয়া।

​শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে (যেমন: নাক, মাড়ি) রক্তপাত হওয়া।

​রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া।

​অতিরিক্ত দুর্বলতা বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রলাপ বকা।

​শ্বাসের কষ্ট হওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।

​২৪ ঘণ্টায় প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কমে যাওয়া বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।

ডেঙ্গু প্রতিকার ও প্রতিরোধ :

​যেহেতু ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট বা শতভাগ কার্যকর একক ওষুধ নেই, তাই মশার বংশবিস্তার রোধ করাই সবচেয়ে বড় প্রতিকার।

​পানি জমতে না দেওয়া: বাড়ির আশপাশে বা টবে, ফুলের টব, এসির পানি, ছাদ বা বারান্দার পাত্রে যেন ৩ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

​মশার কামড় থেকে রক্ষা: দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন। শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক (ফুল হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট) পরিধান করুন।

​মশা তাড়ানোর ক্রিম: প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ক্রিম (Mosquito repellent cream) ব্যবহার করতে পারেন।

​পরিবেশ পরিষ্কার রাখা: বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখুন এবং নিয়মিত স্প্রে বা ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশা নিধনের ব্যবস্থা করুন।

লেখক: ডা. মো. নাফিজুর আলম