সুন্দরগঞ্জে বিনা বেতনের ছুটি, তবু ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ

সুন্দরগঞ্জে বিনা বেতনের ছুটি, তবু ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ
জাহিদ হাসান জীবন, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কোনো অনুমতি ছাড়াই টানা ২৭ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে দণ্ড দেওয়া হয় এবং অনুপস্থিতির পুরো সময়ের জন্য বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়। অথচ সেই সময়ের মধ্যেই ওই শিক্ষককে পরিশোধ করা হয়েছে ১৮ মাসের বেতন—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।অভিযোগটি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন্নাহারের বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা যায়, কামরুন্নাহার কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৭ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
মামলার পর তাকে লঘুদণ্ড ও তিরস্কার করা হয়। একই সঙ্গে অনুপস্থিত থাকার পুরো সময়ের জন্য বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়। বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সার্ভিসবুকেও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কিন্তু এরপরই সামনে আসে ভিন্ন চিত্র। বেতন-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, যে সময়ে ওই শিক্ষককে বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল, সেই সময়ের মধ্যেই ১৮ মাসের বেতন তাকে পরিশোধ করা হয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে সরকারি নথিতে ওই সময়কে বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ের ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে—যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুদ্দিন আনসারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
শুধু কামরুন্নাহারই নন, সুন্দরগঞ্জে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে আরও কয়েকজন শিক্ষকের বিষয়ও সামনে এসেছে।
চর ভাটিবুড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরা আফরোজ মলি ১৫ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা হয়। পরে তাকে অর্ধবেতনে ছুটি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার পর মধ্য শান্তিরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজের বেতন পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর থাকার পরও কীভাবে ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ করা হলো? কে বা কারা এ বেতন অনুমোদন করেছেন এবং সরকারি অর্থ পরিশোধে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাশ বলেন, “এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। হয়তোবা তদন্তে যাবে। এছাড়াও ট্রেজারির মাধ্যমে ফেরত নেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা বিষয়টি শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখব।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পরও বেতন পরিশোধের ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক ভুল, নাকি দায়িত্বে অবহেলা বা আর্থিক অনিয়ম—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ পরিশোধে জড়িতদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
ট্যাগ
জনপ্রিয়
অষ্টগ্রাম হাওরে শীতের আগমনী বার্তা, প্রকৃতিতে ঋতু বদলের ছোঁয়া

অষ্টগ্রাম হাওরে শীতের আগমনী বার্তা, প্রকৃতিতে ঋতু বদলের ছোঁয়া

সুন্দরগঞ্জে বিনা বেতনের ছুটি, তবু ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ

আপডেট সময় : ০৪:৩৬:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাহিদ হাসান জীবন, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কোনো অনুমতি ছাড়াই টানা ২৭ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে দণ্ড দেওয়া হয় এবং অনুপস্থিতির পুরো সময়ের জন্য বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়। অথচ সেই সময়ের মধ্যেই ওই শিক্ষককে পরিশোধ করা হয়েছে ১৮ মাসের বেতন—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।অভিযোগটি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন্নাহারের বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা যায়, কামরুন্নাহার কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৭ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
মামলার পর তাকে লঘুদণ্ড ও তিরস্কার করা হয়। একই সঙ্গে অনুপস্থিত থাকার পুরো সময়ের জন্য বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়। বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সার্ভিসবুকেও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কিন্তু এরপরই সামনে আসে ভিন্ন চিত্র। বেতন-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, যে সময়ে ওই শিক্ষককে বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল, সেই সময়ের মধ্যেই ১৮ মাসের বেতন তাকে পরিশোধ করা হয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে সরকারি নথিতে ওই সময়কে বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ের ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে—যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুদ্দিন আনসারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
শুধু কামরুন্নাহারই নন, সুন্দরগঞ্জে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে আরও কয়েকজন শিক্ষকের বিষয়ও সামনে এসেছে।
চর ভাটিবুড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরা আফরোজ মলি ১৫ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা হয়। পরে তাকে অর্ধবেতনে ছুটি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার পর মধ্য শান্তিরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজের বেতন পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর থাকার পরও কীভাবে ১৮ মাসের বেতন পরিশোধ করা হলো? কে বা কারা এ বেতন অনুমোদন করেছেন এবং সরকারি অর্থ পরিশোধে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাশ বলেন, “এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। হয়তোবা তদন্তে যাবে। এছাড়াও ট্রেজারির মাধ্যমে ফেরত নেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা বিষয়টি শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখব।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পরও বেতন পরিশোধের ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক ভুল, নাকি দায়িত্বে অবহেলা বা আর্থিক অনিয়ম—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ পরিশোধে জড়িতদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন